ইমরান হুসাইন
বাংলাদেশে বছরে গড়ে ৮০ থেকে ১২০ দিন বজ্রপাত হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্ট স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব জিওগ্রাফির অধ্যাপক ড. টমাস ডাব্লিউ স্মিডলিনের ‘রিস্ক ফ্যাক্টরস অ্যান্ড সোশ্যাল ভালনারেবিলিটি’ শীর্ষক গবেষণায় বলা হয়েছে প্রতিবছর মার্চ থেকে মে পর্যন্ত বাংলাদেশে প্রতি বর্গ কিলোমিটার এলাকায় ৪০টি বজ্রপাত হয়। বছরে ১৫০র মতো লোকের মৃত্যুর খবর সংবাদ মাধ্যম প্রকাশ করলেও প্রকৃতপক্ষে এই সংখ্যা ৫০০ থেকে ১ হাজার।’
দুর্যোগ ফোরামের প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০১৭ সালে ২০৫, ২০১৬ সালে ২৪৫, ২০১৫ সালে ১৮৬, ২০১৪ সালে ২১০, ২০১৩ সালে ২৮৫, ২০১২ সালে ৩০১ এবং ২০১১ সালে ১৭৯ জন। দেশের আয়তন হিসেবে বাংলাদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর সংখ্যা অনেক বেশি। এর কারণ সচেতনতার অভাব। ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা বা নেপালে বজ্রপাত হলেও সেখানে মৃত্যুর হার এত বেশি নয়। আবহাওয়াবিদরা জানিয়েছেন, বাংলাদেশে উত্তরাঞ্চল এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল বজ্রপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম। গ্রীষ্মকালে এ অঞ্চলে তাপমাত্রা বেশি থাকায় এ পরিস্থিতির তৈরি হচ্ছে। তাদের মতে, যেসব এলাকায় গ্রীষ্মকালে তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকে সেসব এলাকায় যে মেঘের সৃষ্টি হয়, সেখান থেকেই বজ্রপাতের সম্ভাবনা থাকে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের একজন শিক্ষক তার গবেষণায় জানিয়েছেন, প্রধানত দুটি কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণতার কারণে আবহাওয়া ও জলবায়ুর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে। এর ফলে বৃষ্টিপাতের ধরন ও সময় পরিবর্তন হয়েছে। কালবৈশাখী বেশি হচ্ছে। আর বজ্রপাতের সংখ্যা বা পরিমাণ বেড়ে গেছে। অন্যদিকে আগে গ্রামাঞ্চলে প্রচুর উঁচু গাছ ছিল। তালগাছ, বটগাছ প্রভৃতি। স্বাভাবিক নিয়মে বজ্রপাত হলে এসব উঁচু গাছ তা গ্রহণ করে নিত। কিন্তু এখন তা না থাকায় যখন খোলা মাঠে বজ্রপাত হয় তা মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শহরে গাছ না থাকলেও উঁচু উঁচু ভবন আছে। ফলে শহরের মানুষ এই মৃত্যু থেকে রেহাই পাচ্ছে। আর বজ্রপাতে গ্রামাঞ্চলে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে আনুপাতিকহারে অনেক বেশি।
চলতি বছরের মে পর্যন্ত তথ্যমতে, বজ্রাঘাতে মারা গেছেন ১৩৬ জন। এর মধ্যে কেবল এপ্রিলেই মারা গেছেন ৭০ জন। মে মাসে ৬০ জন। ডিজাস্টার ফোরামের তথ্যমতে, ২০১৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯ মে পর্যন্ত বজ্রাঘাতে মোট ৭৩ জন মারা গেছেন এবং ২৮ জন আহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে ১৪ শিশু, পাঁচ নারী ও ৫৪ জন পুরুষ। ২১ এপ্রিল থেকে ১৮ মে’র মধ্যে নিহত হয়েছেন ১৮ জন। ২০১৮ সালে বজ্রাঘাতে নিহতের ঘটনা ঘটে ২৭৭টি। যেহেতু বজ্রপাতকে আমরা চাইলে বন্ধ করতে পারি না কিন্তু বজ্রপাত নিয়ন্ত্রণে জনসচেতনতা অবলম্বনের মাধ্যমে কিছু নিয়ম-কানুন মেনে চললে বজ্রপাত থেকে রক্ষা পেতে পারি।
(১) বেশি বেশি গাছপালা লাগাতে হবে, তালগাছের সংখ্যা অত্যধিক পরিমাণে হলে ভালো হয়। (২) যখনই আকাশ মেঘলা দেখা যাবে তখনই ঘরে বা নিরাপদে অবস্থান করতে হবে। (৩) বড় গাছ, টিনের খুঁটি ইত্যাদি পরিহার করতে হবে। (৪) মোবাইল ফোন, টিভি, ফ্রিজ বন্ধ করে দিতে হবে। (৫) ধাতব বস্তু থেকে দূরে থাকতে হবে। (৬) অধিক পানি থেকে দূরে থাকতে হবে। (৭) খোলা বা উঁচু জায়গা থেকে সাবধানে থাকতে হবে। (৮) বজ্রপাতের লক্ষণগুলো জানতে হবে। (৯) তাত্ক্ষণিকভাবে প্রাথমিক চিকিত্সা সম্পর্কে অবগত থাকতে হবে।
বজ্রপাতে প্রাণহানি কমাতে জনসচেতনতা সব থেকে জরুরি। আর তাই বজ্রপাত থেকে রক্ষার উপায়সমূহ সম্পর্কে জনগণকে অবগত করতে হবে। প্রকৃতির ওপর অত্যাচার বন্ধ করতে হবে। বেশি বেশি গাছপালা লাগাতে হবে। তাহলে ধীরে ধীরে বজ্রপাতে মৃত্যুর হার কমে আসবে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা