বাড়িতে বাড়িতে ‘টু-লেট’
হাবিবুর রহমান বাদল, নারায়ণগঞ্জ
বেকার, ভাগ্যান্বেষী, বিদ্যান্বেষীসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের ‘স্বপ্ন গড়ার শহর’ ছিল নারায়ণগঞ্জ। সেজন্য দিন দিন এই নগরে মানুষ বাড়ছিল জ্যামিতিক হারে। কিন্তু গত মার্চে দেশে করোনা ভাইরাস হানা দেওয়ার পর সে সব মানুষের স্বপ্ন যেন ভাঙতে শুরু করেছে। গত কয়েক মাসে আয় কমে এমনকি কর্ম হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষ। হতদরিদ্ররা হয়ে পড়েছে আরো অসহায়। জীবিকার এমন সংকট দেখা দেওয়ায় স্বাবলম্বী হওয়ার আশা ভঙ্গের বেদনা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ ছাড়তে শুরু করেছে মানুষ। তাতে নারায়ণগঞ্জের অনেক বাড়িতে ভাড়াটিয়ার সংকট দেখা দিয়েছে। সেজন্য এখন বাড়িতে বাড়িতে ঝুলছে বাসাভাড়া দেওয়ার বিজ্ঞাপন ‘টু-লেট’।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেশের কর্মসংস্থানের সিংহভাগ রাজধানীর পাশের জেলা নারায়ণগঞ্জ হওয়ায় বিভিন্ন অঞ্চলের লোকজন কাজের সন্ধানে নারায়ণগঞ্জ আসতেন। এভাবে নগরীর বাসিন্দার সংখ্যা বেড়ে যায়, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই ভাড়া বাসায় থাকতেন। কিন্তু করোনা ভাইরাস-পরবর্তী পরিস্থিতি বদলে দিয়েছে বাসা ভাড়ার চিত্রও। করোনার কারণে অনেক মানুষ কাজ হারিয়েছেন, অনেক মানুষের শ্রেণি কাঠামোর পরিবর্তন হয়েছে। নতুন করে অনেক মানুষ হতদরিদ্র হয়েছেন। ফলে আগের ভাড়ার ভার বইতে না পেরে ছেড়ে দিচ্ছেন বাসা।
করোনা পরিস্থিতিতে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখে গেছে, বেশির ভাগ বাড়িতেই ঘর বা ফ্ল্যাট ফাঁকা। ‘টু-লেট’ লেখা বিজ্ঞাপন সাঁটানো থাকলেও বাড়ির মালিকরা ভাড়াটিয়া পাচ্ছেন না। বাড়ির মালিকরা জানান, সাধারণ ছুটি বা লকডাউনের কারণে অনেকেই তাদের পরিবার গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়েছেন। পরিবারের উপার্জনের ব্যক্তিটি পরে বাসা ছেড়ে দিয়ে মেস বা ছোট বাসায় উঠেছেন। সে কারণে অনেক বাসা ফাঁকা হয়ে গেছে। এছাড়া এ পরিস্থিতিতে নতুন কেউ বাসা পরিবর্তন করেননি এবং জীবিকার তাগিদে ঢাকায় নতুন মানুষও তেমন একটা আসেননি। যে কারণে বাসাগুলো ফাঁকা। এমন পরিস্থিতি তৈরির ক্ষেত্রে ঠিক মতো বেতন না পাওয়া, কাজ না থাকা ও এমনকি চাকরি হারানোই বড় কারণ।
শহরের আমলাপাড়া এলাকার একটি ভাড়া বাসার বাসিন্দা মকলেসুর রহমান একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তিনিও বাড়ির মালিককে জানিয়ে দিয়েছেন, আগামী মাস থেকে তিনি বাসা ছেড়ে দেবেন। সে অনুসারে বাড়ির মালিকও ‘টু-লেট’ বিজ্ঞাপন লাগিয়েছেন। কেন বাসা ছেড়ে দিচ্ছেন জানতে চাইলে মকলেসুর রহমান বলেন, সীমিত বেতনে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। যেখানে বেতনের সিংহভাগই চলে যায় বাসা ভাড়ায়। স্ত্রী আর এক সন্তান নিয়ে ঐ বাসায় থাকতেন। কিন্তু বিগত দুই মাস ধরে অর্ধেক বেতন পাচ্ছেন। যে কারণে বাসা ভাড়া দেওয়া এবং সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই বাসা ছেড়ে দিয়ে স্ত্রী-সন্তানকে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিয়ে তিনি একটি মেসে উঠবেন। তার মতো অনেকেই বাসা ছেড়ে দিয়েছেন বা ছাড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।