দেশের প্রধান নদনদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে চলতি সপ্তাহে দেশের কয়েকটি জেলায় স্বল্প বা মধ্যমেয়াদি বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় দেশের নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হচ্ছে। কুড়িগ্রাম জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। লালমনিরহাট, গাইবান্ধা ও জামালপুর জেলা এবং সুনামগঞ্জের ছাতক, নীলফামারীর ডিমলা, রংপুরের পীরগাছা উপজেলাসহ বিভিন্ন স্থানে বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে লক্ষাধিক মানুষ। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাড়িঘর, ফসলের খেত।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র জানিয়েছে, এই বন্যার মেয়াদ পাঁচ-সাত দিন অর্থাত্ জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত থাকতে পারে। মৌসুমি বায়ু শক্তিশালী ও সক্রিয় থাকায় উজানের ঢল ও দেশের উত্তরাঞ্চলে অতিরিক্ত বর্ষণের কারণে এই বন্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
বৃষ্টিপাত ও নদনদীর অবস্থা নিয়ে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের শনিবারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। স্থিতিশীল থাকতে পারে লালমনিরহাট ও নীলফামারী জেলার বন্যা পরিস্থিতি। আগামী ৪৮ ঘণ্টায় উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কুশিয়ারা, সোমেশ্বরী এবং ভুগাই-কংশ নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। এছাড়া ২৪ ঘণ্টায় যমুনা নদী সারিয়াকান্দি ও কাজিপুর পয়েন্টে এবং ৪৮ ঘণ্টায় সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে বিপত্সীমা অতিক্রমের শঙ্কা রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন নদ-নদীর ১০১টি পয়েন্টের মধ্যে ৭৮টিতে পানি বেড়েছে। আর হ্রাস পেয়েছে ২৩টিতে।
বন্যা পরিস্থিতি সম্পর্কে সর্বশেষ খবর পাঠিয়েছেন প্রতিনিধি ও সংবাদদাতারা।
কুড়িগ্রাম: কুড়িগ্রামের ২০টি ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। প্রায় ৫০০ হেক্টর জমির আউশ, পাট, ভুট্টা, কাউন, চিনাবাদাম ও শাকসবজির খেত পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম জানান, নদ-নদীর পানি যেহারে বাড়ছে তাতে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।
চিলমারী (কুড়িগ্রাম): উপজেলার মাইলডাঙ্গা, টোন গ্রাম, নটারকান্দি, কড়াই বরিশাল, মনতোলা, ঘোড়ারকুটি, চাচলা, ঢুষমারা, মাঝস্থল এলাকা প্লাবিত হয়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আমন বীজতলা, মরিচ, বেগুন ক্ষেত তলিয়ে গেছে।
লালমনিরহাট: তিস্তা ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে জেলার ১৩টি ইউনিয়নে বন্যা দেখা দিয়েছে। সদর উপজেলার খুনিয়াগাছ, রাজপুর, গোকুন্ডা, মোঘলহাট, কুলাঘাট, আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা, কালীগঞ্জ উপজেলার ভোটমারি, তুষভান্ডার, কাকিনা, হাতীবান্ধা উপজেলার গড্ডিমারী, সির্ন্দুণা, পাটিকাপাড়া ইউনিয়নের ১০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।
গাইবান্ধা: ব্রহ্মপুত্র নদের পানি ফুলছড়ি ঘাট পয়েন্টে শনিবার বিকাল ৩টায় প্রবাহিত হয়েছে বিপত্সীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে। আর ঘাঘট নদী জেলা শহরের নতুন ব্রীজ পয়েন্টে প্রবাহিত হয়েছে বিপত্সীমার ৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে।
জামালপুর: যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। গতকাল বেলা ৩টার দিকে যমুনার পানি বাহাদুরাবাদঘাট পয়েন্টে বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ২৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে দেওয়ানগঞ্জ ও ইসলামপুর উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষ। বেলগাছা ইউনিয়নের মুন্নিয়ারচর ও নোয়ারপাড়া ইউনিয়নের মাইজবাড়িসহ বেশ কিছু এলাকায় নদীভাঙন অব্যাহত রয়েছে।
ডিমলা (নীলফামারী): শুক্রবার সকালে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তার পানি বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার পাঁচ ইউনিয়নের প্রায় ৩ হাজার পরিবার। বন্যায় চরের বাদাম খেত ও বীজতলার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।
পীরগাছা (রংপুর): রংপুরের পীরগাছায় তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। নদী তীরবর্তী এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ৪ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। দেখা দিয়েছে খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকট। সরকারি ও বেসরকারিভাবে এখন পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হয়নি।
সুনামগঞ্জ: সুনামগঞ্জে নদী তীরবর্তী এলাকা ও নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের দায়িত্বশীলরা জানিয়েছেন, গতকাল সকাল ৯টায় সুনামগঞ্জ শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া সুরমা নদীর পানি বিপত্সীমার ৪৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে এবং যাদুকাটার পানি বিপত্সীমার ৫৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
সিলেট অফিস জানায়, উজানের পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণের ফলে সুরমা, কুশিয়ারাসহ বিভিন্ন নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে সিলেট সদর, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট, জাফলং, কানাইঘাট, জকিগঞ্জ উপজেলা বন্যা কবলিত হয়েছে। শনিবার দুপুরে দিরাই উপজেলা থেকে মার্কুলী যাওয়ার পথে একটি যাত্রীবাহী নৌকা হাওরের প্রবল স্রোতের তোড়ে ডুবে গেলে এক বৃদ্ধ ও শিশুর সলিল সমাধি ঘটে।