বিশ্বাস ভিন্ন, তবু শেষকৃত্য তাদেরই হাতে

পাবনা প্রতিনিধি

পাবনার একদল স্বেচ্ছাসেবক করোনায় আক্রান্ত হয়ে কিংবা উপসর্গে মৃতদের শেষকৃত্য সম্পাদনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। আক্রান্ত হবার ভয়ে যখন মৃতদের স্বজন ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও মরদেহের শেষকৃত্য সম্পাদনে অপারগতা প্রকাশ করছে, তখন পরমাত্মীয়ের মতো পাশে দাঁড়াচ্ছেন এই অকুতোভয় স্বেচ্ছাসেবীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী ধর্মীয় রীতি মেনে তারা সত্কার করছেন সব ধর্মের মানুষের মরদেহ।

করোনার শুরুতে পাবনার বড় বড় রাজনৈতিক দলের নেতারা মরদেহ দাফনের ঘোষণা দিয়ে প্রচারণা চালালেও প্রয়োজনের সময় তাদের দেখা মেলেনি। তখন এ কাজে জেলার কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশন ও তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের স্বেচ্ছাসেবীরা এগিয়ে আসেন। গত দেড় মাসে জেলায় করোনা আক্রান্ত কিংবা উপসর্গে মারা যাওয়া অন্তত ২০ জনের মরদেহ সত্কার করেছেন তারা। কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের সত্কার করা মরদেহের মধ্যে একজন খ্রিষ্টান ও দুই জন হিন্দু ব্যক্তিও রয়েছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সম্প্রতি শহরের ব্যাপ্টিস্ট মিশনের বাসিন্দা জেমস সুব্রত গোস্বামী করোনা উপসর্গে মারা যান। ধর্ম পরিচয় ও সামাজিক সংকীর্ণতাকে তুচ্ছ করে যাজকের নির্দেশনায় খ্রিষ্টীয় রীতিতে তাকে সমাধিস্থ করেন কোয়ান্টামের মরদেহ সত্কার দলের সদস্যরা। পাবনায় করোনায় মারা যাওয়া দুই জন সনাতন ধর্মাবলম্বীর মরদেহও সত্কার করেছেন এই স্বেচ্ছাসেবীরা। পাবনা ব্যাপ্টিস্ট মিশনের খ্রিষ্টান কবরস্থান কমিটির সভাপতি কলিট তালুকদার বলেন, স্বেচ্ছাসেবীরা এই দুঃসময়ে যেভাবে কাজ করছে তা করোনাকালে মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত, সাম্প্রদায়িকতা আর হিংসা-বিদ্বেষে ভরা সমাজের জন্য নতুন এক শিক্ষা।

এদিকে করোনা আক্রান্ত রোগীদের মরদেহ দাফনে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবীদের কেউই করোনায় আক্রান্ত না হলেও তারা শিকার হচ্ছেন নানা সামাজিক বিড়ম্বনার। তহুরা আজিজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক দেওয়ান মাহবুব বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মরদেহ দাফনে কাজ করার সময় মানুষ আমাদের দিকে এমন ভাবে তাকায় যেন আমরা কোনো ভয়ংকর জীব। সহযোগিতা তো দূরের কথা ফেরার পথে এলাকার রিকশা-ভ্যানচালকরাও আমাদের নিতে চান না। অথচ সুরক্ষা নির্দেশনা মেনে স্বজন প্রতিবেশীরাই কিন্তু এসব মরদেহ দাফন করতে পারেন।

পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ শনিবার ইত্তেফাককে বলেন, আক্রান্ত রোগীর মরদেহ থেকে করোনা ভাইরাস ছড়ায় না। স্বেচ্ছাসেবীরা মরদেহ দাফনে যেভাবে রাত-দিন প্রশাসনকে সহায়তা করছে, তাতে প্রশাসন তাদের প্রতি আন্তরিকভাবে কৃতজ্ঞ।

এদিকে বৃহস্পতিবার শহরের রাধানগরে কোয়ান্টাম ফাউন্ডেশনের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে সংগঠনটির সত্কার দলের তহবিলে স্থানীয় এমপি গোলাম ফারুক প্রিন্স ১ লাখ টাকার অর্থ সহায়তা প্রদান করেছেন। এ সময় পাবনা প্রেসক্লাব সভাপতি এ বি এম ফজলুর রহমান, দাফন স্বেচ্ছাসেবক মো. হাসানুর রহমান রনি প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।