মো. রাশেদ আহমেদ
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ এবং স্প্যানিশ মহামারির কারণে তত্কালীন সময়ে দীর্ঘ ছয় বছর অর্থনীতি সংকটের মধ্যে পড়েছিল বিশ্ব। পরিবর্তন ঘটেছিল বিশ্বরাজনীতির মঞ্চসহ অধিকাংশ অঙ্গনে। তত্কালীন অস্ট্রিয়া, জার্মানি জাতীয়তাবাদের পতনের মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে উত্থান ঘটেছিল দুই নব পরাশক্তি ফ্রান্স ও ব্রিটেনের, যা তাদের প্রভাব বলবত্ ছিল দীর্ঘ ২৪ বছর অর্থাত্ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-উত্তরকাল পর্যন্ত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ব্যয়ভার বহনে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের ব্যাপক অর্থনীতির ধস ঘটলে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চ থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়ে তত্কালীন দুই পরাশক্তি। উত্থান ঘটে যুক্তরাষ্ট্র এবং নব উদীয় শক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের, যা পরবর্তী সময়ে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে স্নায়ুযুদ্ধে (Cold war) রূপ নেয়। গড়ে ওঠে দুই ব্লক অর্থাত্ যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পশ্চিম ইউরোপ। অন্যদিকে, সোভিয়েতের নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপ। আবার নিজ নিজ আধিপত্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রে ছত্রছায়া পশ্চিম ইউরোপ মিলে গড়ে তোলা হয়েছিল (NATO) ন্যাটো। অন্যদিকে, সোভিয়েতের নেতৃত্বে পূর্ব ইউরোপ গড়ে তুলেছিল (WARS) ওয়ারশ।
১৯৯১ সালে তত্কালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ফলে স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের মধ্যে বিশ্বরাজনীতির আসনে এককেন্দ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব শুরু হয়, যা এখন পর্যন্ত বহাল থাকলেও এই করোনা ভাইরাস সংকটকাল সময়ে বিশ্ব নেতৃত্বে সবচেয়ে কঠিন এবং ক্লান্তিলগ্ন সময় অতিক্রম করছে যুক্তরাষ্ট্র। বর্তমান কোভিড-১৯ ভাইরাস বিশ্বে আক্রান্তের সংখ্যা সর্বশেষ তথ্যমতে, প্রায় ১ কোটি এবং মৃত্যুর সংখ্যা সাড়ে ৪ লাখের বেশি। যার মধ্যে খোদ পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রে মৃত্যুর সংখ্যা ১ লাখ ছাড়িয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনা প্রতিষেধক এখন পর্যন্ত আবিষ্কার না হওয়ায় মৃত্যু কয়েক গুণ ছাড়িয়ে যেতে পারে। কিন্তু করোনার উত্পত্তিস্থল চীনের উহান হলেও এই অদৃশ্য ভাইরাস নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে শুরু করেছে কমিউনিস্টশাসিত বিশ্বে দ্বিতীয় বৃহত্তম বড় অর্থনীতির দেশটি। তবে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা এড়াতে লকডাউনে বিপর্যস্ত যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অর্থনীতি। ফলে প্রতিদিন হুহু করে বাড়ছে বিশ্বে বেকারত্বের হার। এরই মধ্যে শুধু যুক্তরাষ্ট্রে বেকার হয়েছে ৩ কোটি ৩০ লাখ মানুষ। আবার এই অদৃশ্য ভাইরাসের মধ্যে আফ্রিকান মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ জর্জ ফ্লয়েড হত্যাকাণ্ড নতুন করে বর্ণবাদের তীব্র আন্দোলন ট্রাম্প প্রশাসনের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) ভাষ্যমতে, বিশ্বে অর্থনীতি বিপর্যয়ের কারণে ভবিষ্যতে ৩৩০ কোটি মানুষের আংশিক বা পুরোপুরি চাকরি হারাবার শঙ্কা রয়েছে। এ ছাড়া অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে বিশ্বে অনুন্নত বা দারিদ্র্যপীড়িত দেশগুলোতে নতুন করে দুর্ভিক্ষ এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশগুলোতে চরম আকারে খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে। যদিও বর্তমান করোনা ভাইরাসে বিপর্যস্ত ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অর্থনীতির চাকাকে দণ্ডায়মান রাখতে লকডাউন শিথিল এবং কিছুটা ঝুঁকি নিয়ে সীমিত আকারে শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালু রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বর্তমান কোভিড-১৯ ভাইরাসের শেষ গন্তব্য কোথায় তা অনিশ্চিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নোভেল করোনা ভাইরাস প্রথম ধাপ অতিক্রম করে দ্বিতীয় ধাপের প্রাদুর্ভাব হতে পারে আরো বেশি ভয়ংকর। এরই মধ্যে দ্বিতীয় ধাপে ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে যাচ্ছে চীন, জার্মানিসহ বেশ কয়েকটি দেশে—যা ঠিক স্প্যানিশ ফ্লুর মতো, যার দ্বিতীয় ধাপে মৃত্যুর হার প্রথম ধাপের চেয়ে বেশি মারাত্মক। বৈশ্বিক মহামারি নোভেল করোনার কারণে বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা। তাদের অভিমত :বিশ্বে এককেন্দ্রিক যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব এবং অপ্রতিরোধ্য পশ্চিম ইউরোপের প্রভাব বিশ্বরাজনীতিতে ভাটা পড়বে, যা ঠিক ১৯১৮ সালে স্প্যানিশ ফ্লুর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তত্কালীন অস্ট্রিয়া-জার্মানির পতন ঘটে এবং উত্থান হয় ব্রিটেন-ফ্রান্সের। উল্লেখ্য, স্প্যানিশ ফ্লু মহামারির সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত তালিকায় চীন অন্যতম। বর্তমান করোনা ভাইরাস-পরবর্তী বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে নতুন করে দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির পরাশক্তি চীনের আবির্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চীন, ভারত ও নেপালের নতুন করে ত্রিমাত্রিক দ্বন্দ্ব আগামীতে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বরাজনীতির মঞ্চে বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। অন্যদিকে, করোনার প্রভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি টালমাটাল। এমনকি ঘরোয়া রাজনীতিতেও অস্থির সময় অতিক্রম করছে বিশ্বের পরাশক্তি দেশটি। যুক্তরাষ্ট্র এই সংকটকাল সময়ে পাশে নেই মিত্র দেশসহ পশ্চিমাদের পাশে। এমনকি ইউরোপীয় ইউনিয়নের উদ্যোগে Corona virus Global Response নামে ৮১০ কোটি আর্থিক সহায়তায় ইউরোপসহ ৪০টির অধিক দেশ অংশগ্রহণ করলেও যুক্তরাষ্ট্র তাতে সাড়া দেয়নি, যা ভবিষ্যতে খুব সহজভাবে মেনে নেবে না তার মিত্ররা। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, বিশ্বের বড় বড় ঘটনাপ্রবাহের কারণে বিশ্বের রাজনীতির মঞ্চসহ অর্থনীতির হালচালে বড় প্রবাহ ফেলেছিল। এখন দেখার অপেক্ষা করোনা নামের অদৃশ্য ভাইরাস বিশ্বরাজনীসহ ভবিষ্যতে বিশ্ব অর্থনীতিতে কতটা প্রভাব ফেলে।
n লেখক :শিক্ষার্থী, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া