প্রফেসর ইসমাত রুমিনা
শিশু সুস্থ, বুদ্ধিদীপ্ত, সামাজিকভাবে বেড়ে উঠবে সেটা আমরা সবাই চাই। কিন্তু কোন ধরনের পরিবেশ শিশুর এই সুস্থ-সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সহায়ক হবে সে বিষয়ে আমরা অধিকাংশই অবগত নই। শিশুর পারিপার্শ্বিক, সামাজিক ও বস্তুগত পরিবেশ শিশুর শারীরিক ও মানসিক বিকাশে প্রভাব বিস্তার করে। এ কারণে শিশুর পরিপূর্ণ বিকাশের জন্য জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ২৭ নম্বর ধারায় প্রতিটি শিশুর শারীরিক, মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাদের পর্যাপ্ত মানসম্মত জীবনযাপনের অধিকার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত যে শিশুর শারীরিক বিকাশের মতো মানসিক বিকাশের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময় হচ্ছে তার জীবনের প্রথম বছরগুলো। যে শিশুটি জীবনের প্রথম সাত-আট বছর তার বিকাশের জন্য সহায়ক পরিবেশ পায়, সে অন্য শিশুদের (যারা সহায়ক পরিবেশ পায়নি) চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, সামাজিক ও সুস্বাস্থ্যের অধিকারী হয়। তার কথা বলার দক্ষতা, সামাজিক দক্ষতা, আত্মবিশ্বাস প্রভৃতির বিকাশ ঘটে, যা পরবর্তী জীবনে তাকে সুখী ও সুন্দর থাকতে সহায়তা করে।
শিশুরা জীবনের প্রথম বছরগুলো পরিবারের সঙ্গেই কাটায়। পরবর্তী সময়ে স্কুল, শিক্ষক, খেলার সাথি যুক্ত হয়ে শিশুর বিকাশে প্রভাব ফেলতে শুরু করে। বর্তমানে স্কুল বয়সি শিশুরাও গৃহবন্দি অবস্থায় সময় কাটাচ্ছে। আমরা একটু সচেতন হয়ে শিশুদের বিভিন্ন কাজে, খেলায় নিজেদের অন্তর্ভুক্ত করে তাদের সময়টা আরো উপভোগ্য করে তুলতে পারি।
শিশুর সঙ্গে সময় কাটানোর জন্য বয়স অনুযায়ী কী বলতে হবে, কী কী করতে হবে, কোন কাজ কীভাবে করতে হবে—এগুলো জানা জরুরি। এমন কিছু কথা আছে যেগুলো শিশুর সঙ্গে বললে তার মেধা, বুদ্ধি, বোঝার ক্ষমতা অনেক গুণ বৃদ্ধি পায় এবং তা পরবর্তী শিক্ষাজীবনে সহায়ক হয়; আবার অনেক কথা ও কাজ, যা আমরা সচরাচর শিশুদের বলি বা তাদের সঙ্গে করে থাকি, যেগুলো শিশুদের হতাশা, ক্ষোভ ও মানসিক বিপর্যয়ের কারণ হয়।
১। শিশুদের সঙ্গে ইতিবাচকভাবে কথা বলা : ‘শিশুদের জন্য হ্যাঁ বলুন’ উক্তিটি আমরা সবাই জানি। শিশুকে হ্যাঁ বলা অর্থ শিশুকে ইতিবাচকভাবে পরিচালিত করা। শিশুদের প্রতি যেকোনো আদেশ বা নিষেধ ইতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা, নেতিবাচক নির্দেশ না দেওয়া।
২। শিশুর সঙ্গে ভাবের আদান-প্রদান :শিশুর সঙ্গে কথা বলার সময় গলার স্বর নরম ও আন্তরিক হতে হবে। জোরে বা কর্কশ স্বরে কথা বললে শিশু ভয় পায়, ঐ ব্যক্তিকে এড়িয়ে চলে। শিশুর চারপাশের পরিবেশ যদি ভয়শূন্য ও বন্ধুত্বপূর্ণ হয়, তাহলে সে নিজেকে প্রকাশ করার সুযোগ পায়।
৩। শিশুকে দৈনন্দিন কাজের দক্ষতা শেখানো : আমরা অনেক সময় মনে করে থাকি, ছোট বয়সে তাদের নিজের কাজগুলো করার দরকার নেই। বড় হলে সবই করবে। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই শিশুকে তার নিজের কাজে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। কারণ এই সময়ের মধ্যে শেখানো না হলে জীবনভর শেখার মজবুত ভিত্তি গড়ে না-ও উঠতে পারে। ফলে পরবর্তী সময়ে তার জন্য দক্ষতা অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। নিজের খাবার খাওয়া, পোশাক পরা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ইত্যাদিতে অনেক শিশুরই অনীহা দেখা দেয়। প্রথম দিকে তার এই কাজগুলোতে বড়দের সহায়তা দরকার।
৪। খেলার সরঞ্জাম ও স্থান :প্রারম্ভিক শৈশবে খেলাই শিশুর প্রধান কাজ। খেলার উপযুক্ত পরিবেশ পেলে শিশু কম বিরক্ত করে এবং সে তার সময় আনন্দে কাটায়। অনেক বাড়িতেই বিভিন্ন শোপিস, ফুলের টব দিয়ে বাড়ি সাজানো থাকে। শিশুকে এগুলো ধরতে, নাড়াচাড়া করতে মানা করা হয় বা হঠাত্ ভেঙে ফেললে বকাবকি করা হয়। সবচেয়ে ভালো হয় বিকাশের প্রারম্ভিক স্তরে এসব সরঞ্জাম শিশুর নাগালের বাইরে রাখা বা সরিয়ে ফেলা। শিশুদের ঘরে চলাচলের সুবিধার জন্য প্রশস্ত ও নিরাপদ জায়গা থাকা দরকার।
৫। শিশুর লালন-পালনে বাবার ভূমিকা :শিশুর লালন-পালনে বাবার অংশগ্রহণ মায়ের তুলনায় কোনো অংশেই কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। গবেষকেরা দেখেছেন, বাবার সঙ্গে শিশুর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক শিশুর ইতিবাচক বিকাশে ভূমিকা রাখে। বাবা যদি সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দেন, সন্তান পালনে স্নেহপূর্ণ অংশ নেন, সেসব শিশুর মধ্যে বিভিন্ন আচরণগত সমস্যা কম দেখা যায়। এমনকি বাবার অংশগ্রহণ কৈশোরের মাদকাসক্তি বা অপরাধমূলক কাজ প্রতিরোধে সহায়তা করে।
একজন বাবা শিশুর সঙ্গে খেলায় অংশ নিয়ে গান, ছড়া, গল্প শোনানো, বাইরে বেড়াতে নিয়ে যাওয়া (যা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়) ইত্যাদির মাধ্যমে শিশুর সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তীয় বিকাশে সহায়তা করতে পারেন। একজন বাবা তার জীবনের ছোটবেলার অভিজ্ঞতা বা তার জানা কোনো অনুপ্রেরণামূলক গল্প বলে সহজেই সন্তানের আচরণে পরিবর্তন আনতে পারেন।
আমাদের শিশুরাই আমাদের ভবিষ্যত্। শিশুকে তার সক্ষমতা অনুযায়ী পরিপূর্ণরূপে বিকশিত হতে আমাদের অনেক বেশি সচেতনতা প্রয়োজন। আসুন, শিশু বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জীবনের প্রথম বছরগুলোতে আমরা শিশুর জন্য নিরাপদ, উদ্দীপনা সৃষ্টিকারী সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে সচেষ্ট হই। পরিবারের প্রিয়তম অমূল্য সম্পদ শিশুটি সহদেশের সব শিশুর জন্য উজ্জ্বল ভবিষ্যত্ গড়ে তুলতে অবদান রাখি।
n লেখক :অধ্যক্ষ, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজ, আজিমপুর, ঢাকা