নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় দেশের নতুন নতুন এলাকা বন্যাকবলিত হচ্ছে। তবে সুনামগঞ্জ, সিলেটসহ কিছু কিছু এলাকায় পানি কমতে শুরু করায় সেসব এলাকায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। গাইবান্ধা ও ঘিওরে নদীভাঙনের তীব্রতা বেড়ে গেছে। জামালপুরে পানিতে ডুবে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমোর, তিস্তাসহ বিভিন্ন নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার অনেক ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কুড়িগ্রামের ৭৩টি ইউনিয়নের মধ্যে ৫০টি ইউনিয়নই প্লাবিত হয়ে দেড় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। সোমবার বিকেলে ধরলা নদীর পানি বিপত্সীমার ৭৩ সেন্টিমিটার, ব্রহ্মপুত্র নদের পানি চিলমারী পয়েন্টে ৭৬ সেন্টিমিটার বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
ধরলা ও ব্রহ্মপুত্র অববাহিকার গ্রামগুলোতে পানি প্রবেশ করায় তলিয়ে গেছে বিস্তীর্ণ ফসলের খেত। দেখা দিয়েছে গোখাদ্যের সংকট। বন্যার পানির তোড়ে ঝুঁকিতে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রতিরক্ষা বাঁধসহ সদ্য মেরামত করা বাঁধগুলো।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আরিফুল ইসলাম জানান, আগামী দুই-তিন দিনে ব্রহ্মপুত্র, দুধকুমোর ও ধরলা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার এক মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে। এতে সদর উপজেলাসহ উলিপুর, চিলমারী, রৌমারী ও রাজীবপুর উপজেলার বেশ কিছু অঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।
সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সিরাজগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী এ কে এম রফিকুল ইসলাম গতকাল সকালে জানান, সিরাজগঞ্জ পয়েন্টে যমুনার পানি ২৪ ঘণ্টায় ২৯ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়ে বিপত্সীমার ২৬ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে প্রতিদিনই প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা। সিরাজগঞ্জ সদর, কাজীপুর, বেলকুচি, চৌহালী ও শাহজাদপুর উপজেলার চরাঞ্চল ও নিম্নাঞ্চলের বসতবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ায় অনেকে গবাদিপশু নিয়ে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধসহ উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিয়েছেন।
সারিয়াকান্দি (বগুড়া) সংবাদদাতা জানান, গতকাল সেখানে যমুনার পানি বিপত্সীমার ৬০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। চরাঞ্চলের কাজলা, চালুয়াবাড়ী, হাটশেরপুর, কর্নিবাড়ী, চন্দনবাইশা ও বোহাইল ইউনিয়নের ৬৮টি গ্রামের প্রায় ৬৫ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। চর এলাকায় ৭৫০টি বাড়িঘর নদীভাঙনের কবলে পড়েছে। ৬ হাজার ৬৩২ হেক্টর জমির ফসল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ১৬ কিলোমিটার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের বিভিন্ন পয়েন্টে ফাটল দেখা দিয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে বাঁধ মেরামত করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, বন্যায় জেলার পাঁচটি উপজেলার ২১টি ইউনিয়নের প্রায় ১১ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। তলিয়ে গেছে আমন ধানসহ বিভিন্ন ফসলের খেত।
জামালপুরে পানিতে পড়ে শিশুর মৃত্যু
জামালপুর প্রতিনিধি জানান, যমুনার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জামালপুরে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হয়েছে। গতকাল বাহাদুরাবাদ পয়েন্টে যমুনার পানি বিপত্সীমার ৮৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। জেলার ইসলামপুর, দেওয়ানগঞ্জ, মাদারগঞ্জ, মেলান্দহ, সরিষাবাড়ী ও বকশীগঞ্জ উপজেলার ২০টি ইউনিয়নের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। খাবার ও বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে। বন্যার পানিতে পড়ে মাদারগঞ্জ উপজেলার মির্জাপুরে সোহান নামে সাত বছরের এক শিশু মারা গেছে।
গাইবান্ধা ও ঘিওরে নদীভাঙন
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা ও ঘাঘটে পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফুলছড়িতে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনের মুখে পড়েছে উপজেলার জিগাবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। এছাড়া গতকাল সোমবার পশ্চিম জিগাবাড়ী এলাকার ৪২টি পরিবার নদীভাঙনে ভিটেমাটি হারিয়েছে। গতকাল ব্রহ্মপুত্রের পানি বৃদ্ধি পেয়ে ফুলছড়ির তিস্তামুখ ঘাট পয়েন্টে বিপত্সীমার ৮০ সেন্টিমিটার ও ঘাঘটের পানি নতুন ব্রিজ পয়েন্টে বিপত্সীমার ৫৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।
ঘিওর (মানিকগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কালীগঙ্গা নদীর পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ভাঙনের তীব্রতাও বেড়ে গেছে। ইতিমধ্যে নদীতে বিলীন হয়ে গেছে বানিয়াজুরি ইউনিয়নের অর্ধশত বসতবাড়ি, প্রায় এক কিলোমিটার কাঁচা রাস্তা, মসজিদ, মাদ্রাসা ও ঈদগাহ মাঠ। এছাড়া ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো দুই শতাধিক বসতবাড়ি, একটি বিদ্যালয়, একটি মাদ্রাসা, এতিমখানা, একটি ব্রিজ, বাজার, রাস্তাসহ বিস্তীর্ণ ফসলি জমি।
সিলেটে কমছে পানি, বাঁধ কেটে দিল দুর্বৃত্তরা
সিলেট অফিস জানায়, সিলেটে সুরমা নদীর পানি কোনো কোনো স্থানে কমলেও সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে কানাইঘাটে পানির চাপ বৃদ্ধি পেলে শনিবার রাতের আঁধারে বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ কেটে দেয় একদল দুর্বৃত্ত। পরে স্থানীয় জনসাধারণের সহায়তায় প্রশাসনের লোকজন আবার বাঁধটি মেরামত করে।
সুনামগঞ্জে কমছে নদীর পানি, কমছে বন্যাও
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা নদীর পানি কমতে শুরু করেছে। এতে পৌর শহরের কাজীর পয়েন্ট, ঘোলঘর, উকিলপাড়া, হাছননগরসহ বেশ কিছু এলাকার বাড়িঘর থেকে পানি নেমে গেছে।