গত পহেলা জানুয়ারি ছিল বিশ্ববিখ্যাত বাঙালি বিজ্ঞানী প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্মদিন। তার সম্মানে ১৯৩৩ নোবেল বিজয়ী পল ডিরাক বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান মান্যকারী কণার নামকরণ করেন ‘বোসন’ (Boson)। অতি নিম্ন তাপমাত্রায় বোসন কণা/অণু এক স্টেটে একত্রিত হয়ে নতুন এক ‘বোস-আইনস্টাইন ঘনীভবন দশা (BEC) বা সুপ’ সৃষ্টি করে। ১৯৯৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রস্থ ইউনিভার্সিটি অব কলোরাডোর এরিক কর্নেল ও কার্ল ভাইম্যান রুবিডিয়াম-গ্যাসে এবং MIT এর উল্গ্যাং কেটার্যাল সোডিয়াম-গ্যাসে পরীক্ষণের মাধ্যমে BEC প্রদর্শন করে ২০০১ সালে নোবেল পুরস্কার অর্জন করেন। ইউরোপ এবং যুক্তরাষ্ট্রে অনেকের মত, বসুকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া উচিত ছিল।
সত্যেন্দ্রনাথ বিদগ্ধ-সমাজে ‘আচার্য বসু’ নামে খ্যাত। বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিতে আমাদের তথা সব অস্তিত্বের চাবিকাঠি হিগ্স বোসন বা “ঈশ্বর-কণা”। এজন্য অনেকে সত্যেন বসুকে ‘ঈশ্বর-কণার জনক’ বলে অভিহিত করেছেন। ১৯৬৪ সালে স্বতন্ত্রভাবে হিগ্স বোসন আবিষ্কারের জন্য পিটার হিগ্স এবং ফ্রঙ্কো ইংলার্টকে পদার্থবিজ্ঞানে ২০১৩ সালের নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। অন্যদিকে ২০১৫ সালের পরীক্ষণে এক শত বছর পূর্বে আইনস্টাইন-এর সাধারণ আপেক্ষিকতা তত্ত্ব অনুযায়ী স্থান-কাল জালে আন্দোলনের মাধ্যমে যে মহাকর্ষ তরঙ্গ এবং বল সৃষ্টি হয়, তা উদ্ঘাটিত হয়েছে। কোয়ান্টাম মহাকর্ষ ক্ষেত্রতত্ত্ব অনুযায়ী মহাকর্ষ বলের বাহক ‘গ্রাভিটন’ (Graviton) ভরবিহীন স্পিন-২ সম্বলিত টেনসর ‘গেজ বোসন’। দেখা যাচ্ছে, বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যানের বোসন কণা, এর জন্মলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্য উন্মোচনে জয়যাত্রা অব্যাহত রেখেছে।
সত্যেন্দ্রনাথ বসু কলকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে ১৯১৩ সালে প্রথম শ্রেণিতে প্রথম হয়ে বি.এস-সি এবং ১৯১৫ সালে একই ফলাফল নিয়ে মিশ্র-গণিতে এম.এস-সি ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯১৫ সালে উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ বসু ও তাঁর সতীর্থ মেঘনাদ সাহাকে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ দেন। বসু এবং সাহা সেখানে গবেষণা শুরু করেন। ১৯২০ সালের মধ্যেই সত্যেন্দ্রনাথের এককভাবে বা মেঘনাদসহ ৪টি গবেষণা প্রবন্ধ এবং আইনস্টাইন ও মিংকোভিস্ক-র ‘আপেক্ষিকতা নীতি’ জার্মান থেকে ইংরেজিতে অনুবাদ প্রকাশিত হয়। প্রথাগতভাবে বসু বা সাহা কেউই পদার্থবিদ্যার ছাত্র ছিলেন না। নিজেরা পরিশ্রম করেই পদার্থবিজ্ঞান আয়ত্ত করেছিলেন।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর পদার্থবিদ্যায় ১টা রিডার পদ বিজ্ঞাপিত হয়। খ্যাতনামা কয়েকজন আবেদনকারীর মধ্যে শক্তিশালী ছিলেন ড. মেঘনাদ সাহা ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু। বিদেশে না গিয়েও Phil. Mag. 40 (1920) -এ উচ্চমানের প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন বিবেচনায় বসু নিয়োগ প্রাপ্ত হন। এর পর ১ জুন, ১৯২১ তারিখে সত্যেন বসু ঢাবি-এর পদার্থবিদ্যা বিভাগে রিডার হিসেবে চাকরিতে যোগদান করেন। ঢাবিতে তাপ-বিকিরণতত্ত্ব পাঠদানের সময় বসু উপলব্ধি করেছিলেন যে, প্লাঙ্কের কৃষ্ণকায়া বিকিরণ সূত্রে তাঁর নব-আবিষ্কৃত কোয়ান্টাম শক্তি ব্যবহার করা হলেও আলো-কে তড়িত্-চৌম্বক তরঙ্গ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এ কারণে প্লাঙ্কের কৃষ্ণকায়া বিকিরণ সূত্রে যৌক্তিক অসঙ্গতি রয়েছে। সত্যেন বসু কোয়ান্টাম তত্ত্ব অনুসারে আলো-কে শুধু কণা হিসেবে বিবেচনা করে প্লাঙ্কের বিকিরণ সূত্র পুনর্গঠন করেন। কালজয়ী এই গবেষণা কাজ সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধটি যুক্তরাজ্যের বিখ্যাত Phil. Mag. জার্নালে প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর আইনস্টাইন প্রবন্ধটি জার্মান ভাষাতে অনুবাদ করে, Z. Phys.-এ তাঁর ভালো মন্তব্যসহ পাঠিয়েছিলেন। প্রবন্ধটি অতি সত্বর ১৯২৪ সালেই Planck’s Law and the Light Quantum Hypothesis, Z. Phys. 26, pp.168-71, 1924 তথ্যসূত্রে প্রকাশিত হলো। প্রবন্ধটির মাধ্যমে কোয়ান্টাম পরিসংখ্যানের স্রষ্টা হিসেবে সত্যেন বসু নিজে বিশ্ববরেণ্য হলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পেল বিশ্ব-পরিচিতি, ঘটল বিজ্ঞানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের রেঁনেসা। ১৯২৪ ও ১৯২৫ সালে আইনস্টাইন Royal Prussian Academy of Sciences -এ এক-যোজী আদর্শ গ্যাসের উপর ২টি প্রবন্ধ পরিবেশন করেন। এর সুবাদে পরিসংখ্যানটিতে আইনস্টাইনও যুক্ত হন এবং এর নাম হয় ‘বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান’। সত্যেন বসুর নিজস্ব ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ব-পরিচিতির কারণে বসু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরম অর্থ সংকটেও অগ্রিম অর্থ মঞ্জুরীসহ ইউরোপ সফরের অনুমতি লাভ করেন।
১৯৭৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সম্মানে ‘বোস প্রফেসর’ পদ সৃষ্টি করে এবং তাঁর স্মরণে ‘বসু গবেষণা কেন্দ্র’ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৮৬ সালে কলকাতা শহরে বসুর নামে ‘সত্যেন্দ্রনাথ বসু জাতীয় মৌলিক বিজ্ঞান কেন্দ্র’ স্থাপিত হয়। সম্প্রতি ২৮-০৬-২০১৭ তারিখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পদার্থবিদ্যা বিভাগে ‘এস এন বোস মিউজিয়াম’ প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সত্যেন বসু তাঁর শিক্ষক আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু ও আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের মতো মাতৃভাষা বাংলাতে বিজ্ঞানচর্চার পক্ষপাতি ছিলেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় ১৯৪১ সালে ঢাকায় ‘বিজ্ঞান পরিচয়’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। ক্লাসে পাঠদান ও গবেষণা সম্পূরক। বোস-পরিসংখ্যানের জন্ম ক্লাসে পাঠদান থেকে। এছাড়াও শিক্ষক-শিক্ষার্থীর অকপট সম্পর্ক গবেষণাকে গতিশীল করে। বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টি রহস্য উদ্ঘাটনে বোসনের ভূমিকা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্ব-দরবারে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই সত্যেন বসুর জন্মদিন (১ জানুয়ারি)-কে জাতীয় বিজ্ঞান-দিবস হিসেবে পালন করলে আমাদের বিজ্ঞানচর্চা গতিশীল হবে।
n লেখক :প্রফেসর এমেরিটাস, পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ফেলো, বাংলাদেশ একাডেমি অব সাইন্সেস