যমুনার চরাঞ্চল সিরাজগঞ্জের চৌহালী উপজেলার স্থল ইউনিয়নজুড়ে একটি পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুল না থাকায় মাধ্যমিক শিক্ষার প্রসার ব্যাহত হচ্ছে। অনেকেই ৮ম শ্রেণির পরে আর লেখাপড়া করতে পারছে না। যারা করছে তারা নদী পাড়ি দিয়ে অতিকষ্টে ১৮ কিলোমিটার যাতায়াত করে করছে। এতে প্রতিদিন কৃষক পরিবারের সন্তানদের চলাচলের ভাড়া হিসাবে গুনতে হয় অন্তত ৬০ টাকা। যাদের দৈনিক এই ব্যয়ের সামর্থ্য নেই তারা ঝরে পড়ছে। এ অবস্থায় ৫৪ বছর আগে ওই এলাকায় প্রতিষ্ঠিত বসন্তপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি নবম ও দশম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদানের জন্য পূর্ণাঙ্গ হাইস্কুলের অনুমোদন দেয়া হলে অন্তত ৩শ ছাত্র-ছাত্রীর দুর্ভোগ লাঘব হতো।
জানা যায়, স্থল ইউনিয়নের মালিপাড়া, নওহাটা, তেঘুরী, হাটবয়রা, নয়াপাড়া, গোসাইবাড়ি, গোয়ালবাড়ি, চালুহারাসহ প্রায় ১৬টি গ্রামের একমাত্র বসন্তপুর নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে ৬ষ্ঠ থেকে ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শেখানো হয় ছাত্র-ছাত্রীদের। এরপর যারা জেএসসি পাস করে থাকে, তাদের ৯ম ও ১০ম শ্রেণিতে পাঠদানে বিপাকে পড়তে হয়। যেতে হয় ৯ কিলোমিটার দূরের এনায়েতপুরের মেহের-উন নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, এনায়েতপুর ইসলামীয়া বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়, বেতিল বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে। এতে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের দুর্ভোগের যেমন সীমা থাকে না। যাতায়াতে গড়ে প্রতিদিন ৬০ টাকা হারে না হলে আর স্কুলে যাওয়া যায় না কোমলমতি শিক্ষার্থীদের।
এ ব্যাপারে হাটবয়ড়া চরের বাসিন্দা বেতিল উচ্চ বিদ্যালয়ের ৯ম শ্রেণির ছাত্রী সোনিয়া খাতুন, এনায়েতপুর ইসলামীয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণির ছাত্র কুড়াগাছা চরের শরীফ হোসেন, নওহাটার ৯ম শ্রেণির আঁখি খাতুন, মেহের-উন-নেছা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ শ্রেণির ছাত্রী গোয়ালবাড়ি গ্রামের সাবেকুন্নাহার জানান, আমাদের ৯ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিজ-নিজ স্কুলে যেতে হয়। ভোরে ঘুম থেকে উঠেই হাটবয়ড়া খেয়াঘাটের নৌকা ধরতে হয়। আবার সেই সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরি। লেখাপড়া চালাতে প্রতিদিন অনেক কষ্ট করি। যাতায়াতেই সময় ফুরিয়ে যায়। শুধু রাতে পড়ে ভালো রেজাল্ট করা যায় না।
গোয়ালবাড়ির নবম শ্রেণির ছাত্র আব্দুল কাদের, তেঘুরীর দশম শ্রেণির আলামিন হোসেন জানান, আমরা দরিদ্র কৃষকের ছেলে। ১৮ কিলোমিটার যাতায়াতের চেয়ে বাড়ির পাশের বিদ্যালয়ে যদি মাধ্যমিক লেখাপড়ার সুযোগ থাকতো তাহলে ভালো হতো।
বর্তমানে বসন্তপুর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয় হতে জেএসসি পাস করা ছোট চৌহালীর খাদিজার পিতা রুহুল আমীন এবং গোয়ালবাড়ির সুজনের পিতা খোকন হোসেন জানান, আমরা দরিদ্র মানুষ। এভাবে দূরে পাঠিয়ে টাকা-পয়সা খরচ করিয়ে ছেলে-মেয়েদের পড়ানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।
স্থানীয় সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ও বসন্তপুর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সভাপতি হাতেম আলী মাষ্টার, বিদ্যালয়ের প্রধান সাইফ উদ্দিন ইয়াহিয়া, ইউপি সদস্য আলেয়া বেগম এবং সমাজ-সেবক শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন জানান, দেশ যেখানে সামগ্রিক দিক থেকে উন্নয়নে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে আমরা শুধু শিক্ষা ব্যবস্থায় পিছিয়ে আছি। আমাদের অবহেলিত এই চর এলাকার ছাত্র-ছাত্রীরা মাধ্যমিক শ্রেণি পর্যন্ত নিজ এলাকায় থেকে করতে পারছে না। আমরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছি, যেন বসন্তপুর নিম্ন-মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিকে ৯ম ও ১০ শ্রেণি পাঠদানের অনুমোদন দেওয়া হয়। তবে এবার আশাকরি প্রধানমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী আমাদের চরবাসীদের প্রতি সদয় হবেন।
এদিকে, বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে জানিয়ে সিরাজগঞ্জ জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ শফিউল্লাহ জানান, চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যালয় স্থাপনের প্রাথমিক কাজ শেষ হয়েছে। শুধু মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন হলে স্থল ইউনিয়নের মানুষের মাধ্যমিক পাঠদানে দুর্ভোগ লাঘব হবে।