দারিদ্র্যতাকে জয় করে আত্মকর্মসংস্থানে সফল নারী ইছমেতারা

দারিদ্র্যের কষাঘাতে জর্জরিত ৯ সদস্যের পরিবারকে সচ্ছলতায় উন্নীত সেই সাথে পাঁচ শতাধিক দুস্থ মহিলাকে স্বাবলম্বী করে তোলার এক সংগ্রামী নারী ইছমেতারা। যিনি তার সৃজনশীল আত্মকর্মসংস্থানের স্বীকৃতিস্বরূপ জাতীয় যুব পদক পেয়েছেন। গত ১ নভেম্বর জাতীয় যুব দিবসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার হাতে পদক তুলে দেন। তিনি আত্মকর্মসংস্থান ক্ষেত্রে জাতীয় পর্যায়ে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেছেন।

শেরপুর সদর উপজেলার পাকুরিয়া ইউনিয়নের বাদা তেঘরিয়া গ্রামের দরিদ্র কৃষক পরিবারে ইছমেতারা সরকারের জন্ম। বাবা ইউসুফ আলী মা হাসনারা বেগম। ৭ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয়। বড় ভাই বেকার কর্মবিমুখ। ফলে তাদের সংসারে চলে অভাবের নিত্য আনাগোনা। এসএসসি পাস করার পরপরই তার বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েন। অভাব তীব্রতর হয়। পরিবারের দ্বিতীয় সন্তান হওয়ার কারণে এ অবস্থা থেকে উত্তরণের দায়িত্ব তার কাঁধে চেপে বসে। এ দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি ১৯৮৮ সালে বিসিক থেকে তিন মাসের প্রশিক্ষণ নিয়ে স্বল্প পরিসরে পোশাক তৈরি শুরু করেন। সীমিত আয়। এ আয় দিয়েই তিনি সংসারটাকে কোনোমতে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন।

এ সময়ই একটি অনভিপ্রেত ঘটনা তাকে ভাবিয়ে তোলে। তার এক প্রতিবেশীর বোনকে যৌতুকের কারণে স্বামী তালাক দিয়ে বাপের বাড়িতে ফেরত পাঠায়। মেয়েটির অসহায়ত্বের চিত্র তার মনে গভীর রেখাপাত করে। তার করুণ মুখ ইছমেতারাকে নতুন করে বাঁচার সংগ্রামে অবতীর্ণ হতে উদ্বুদ্ধ করে। তিনি ঐ মেয়েটিকে সাথে নিয়ে ১৯৯৯ সালে শেরপুর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তর থেকে চার মাসব্যাপী উন্নত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেখানে সেলাই প্রশিক্ষণে বিশেষ দক্ষতার পরিচয় দেন তিনি। এ দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ইছমেতারা গড়ে তোলেন ‘বাংলার পণ্য হস্তশিল্প প্রকল্প’। এরপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিরলস শ্রম আর যুগোপযোগী চাহিদা আর পরিকল্পনায় তিনি এখন আত্মনির্ভরশীল।

কর্মসংস্থান ব্যাংক ও যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের ঋণ সহায়তায় প্রতিষ্ঠানের শক্ত ভিত গড়ে উঠেছে। বর্তমানে তার প্রকল্পে বেতনভুক্ত ছয় জন পুরুষ ও ১৩ জন মহিলা কর্মী রয়েছে। বিভিন্ন গ্রামে-গঞ্জে রয়েছে কয়েকশ’ মহিলা শ্রমিক। যারা তার প্রতিষ্ঠান থেকে দেওয়া পোশাকে নকশা তোলার কাজ করে। এ ছাড়া তিনি সেখানে নারীদের হাতে-কলমে কাজ শেখান। তার প্রকল্পের বর্তমান মূলধন ২৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা। বার্ষিক নিট আয় ৮ লাখ ২২ হাজার টাকা। এ প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখে নতুন করে ১৮ জন যুব উদ্যোক্তা সফল আত্মকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এ ছাড়াও তিনি ‘বহুমুখী সমাজ উন্নয়ন সংস্থা’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে তিনি নারীর ক্ষমতায়ন, নারী ও শিশু নির্যাতন রোধ, যৌতুক বিরোধী কর্মসূচি, লিঙ্গবৈষম্য দূরীকরণ, বাল্যবিবাহ বন্ধ, মাদক বিরোধী কার্যক্রমসহ নানাবিধ সমাজ সচেতনমূলক কাজ পরিচালনা করছেন। ইছমেতারা সরকার জানান, নারী বলে নিজেকে অসহায় ভাবার কোনো অবকাশ নেই। নিজের স্বপ্ন, আত্মবিশ্বাস সেই সাথে পরিশ্রম করার মনমানসিকতা থাকতে হবে। তবেই সাফল্য হাতের মুঠোয় আসবে।