জনপ্রশাসন রাষ্ট্রব্যবস্থা পরিচালনার একটি অপরিহার্য অঙ্গ। তাহাদের দক্ষতার উপর দেশের শাসনব্যবস্থার মান নির্ভরশীল। তাহাদের নিয়োগপ্রক্রিয়া, বিশেষ করিয়া বৈষম্যমূলক কোটাব্যবস্থা সতত প্রশ্নবিদ্ধ হইয়া আসিতেছিল। সমাজে ক্ষোভ সৃষ্টিরও কারণ হইয়া দাঁড়াইয়াছিল। অধিক মেধাবীদের উপেক্ষা করিয়া প্রাধিকার কোটায় কম মেধাবীদের নিয়োগের সুযোগ জনপ্রশাসনের দক্ষতা হ্রাসে ভূমিকা রাখিয়াছে বলিয়া অভিযোগ ছিল। চাকুরির সুযোগ লাভে সমতার যে সাংবিধানিক অঙ্গীকার, তাহার বিপরীতে যুগ যুগ ধরিয়া চালু ছিল ভিন্ন ব্যবস্থা। আর ইহার সম্প্রসারণ ঘটে অনির্দিষ্ট সময়ের জন্যও। বিশেষ করিয়া সরকারি কর্ম কমিশনের মাধ্যমে (পিএসসি) প্রথম শ্রেণির গেজেটেড সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগে কোটার ভারে বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া মেধাবীরা অপাঙেক্তয় হইয়া পড়িয়াছিলেন। ইহার ফলে সরকার মেধাবীদের সেবা হইতে বঞ্চিত হইতেছিল। অধিকতর মেধাবী হওয়া সত্ত্বেও সরকারি কর্মকর্তা হইবার সুযোগ না পাইয়া অনেকে বিদেশ পাড়ি দেন। এই প্রেক্ষাপটে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে বহুকাল ধরিয়া চলিয়া আসা সেই কোটাব্যবস্থা বাতিল ঘোষণা করিয়াছে সরকার। গতকাল পিএসসির চেয়ারম্যান বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তা নিয়োগে কোটা যুগের অবসান ঘোষণা করিয়াছেন। তিনি বলিয়াছেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে এখন হইতে পরবর্তী আর কোনো বিসিএস পরীক্ষায় কোটার বালাই থাকিবে না। এমনকি, কোটা বাতিলের মাসখানেক পূর্বে ৪০তম বিসিএসের যে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ হইয়াছে ঐ বিসিএসেও কোটা পদ্ধতি থাকিবে না। ইহার ফলে সাধারণ পরিবারের মেধাবী শিক্ষার্থীদের চাকুরির সুযোগ অবারিত হইবে বলিয়া আমরা আশাবাদী। পিএসসির পক্ষ হইতে বলা হইয়াছে, এতদিন ৫৫ শতাংশ কোটায় এবং ৪৫ শতাংশ মেধায় নিয়োগ প্রদান করা হইতেছিল। মঙ্গলবার ৩৮তম বিসিএসের চূড়ান্ত ফলের মধ্য দিয়া কোটাযুগের পরিসমাপ্তি ঘটিল।
উল্লেখ্য, কোটার পরিমাণ ১০ শতাংশে নামাইয়া আনার দাবিতে ২০১৮ সালের শুরুর দিকে জোরালো আন্দোলন গড়িয়া তোলে ‘বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’-এর ব্যানারে সাধারণ শিক্ষার্থীগণ। আন্দোলনের এক পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৮ সালের ১১ এপ্রিল সংসদে বলেন, ‘সরকারি চাকুরিতে কোটা পদ্ধতিই আর রাখা হইবে না।’ অতঃপর সরকারি চাকুরিতে বিদ্যমান কোটা পদ্ধতি পর্যালোচনা করিতে ঐ সময়কার মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলমের নেতৃত্বে ২০১৮ সালের ২ জুন একটি কমিটি করে সরকার। কমিটির সুপারিশে প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণির সরকারি চাকুরিতে কোটা বাতিল করে মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর অনুমোদন দেয় মন্ত্রিসভা। সকল ধরনের কোটা বাতিল করা হইলেও প্রতিবন্ধী কোটা বহাল থাকিবে বলিয়া জানাইয়াছিলেন মোহাম্মদ শফিউল আলম। উল্লেখ থাকে যে, বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর প্রথম ১৯৭২ সালে সরকারি চাকুরির ক্ষেত্রে কোটাব্যবস্থার প্রবর্তন করা হয়। সেই সময় মেধাতালিকা ২০ শতাংশ বরাদ্দ রাখিয়া ৪০ শতাংশ জেলাভিত্তিক, ৩০ শতাংশ বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অংশগ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারের সদস্যদের জন্য এবং ১০ শতাংশ যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে ৫৫ শতাংশ কোটার পুনর্বিন্যাস করা হয়। আশা করা হইতেছে, কোটা প্রথা বিলুপ্তি কার্যকর হইলে একদিকে যেমন সাধারণ শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা পূরণ হইবে, অন্যদিকে দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অভিযোগের যবনিকা ঘটিবে। প্রকৃত মেধাবীরা সরকারি চাকুরির ব্যাপারে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নামিতে উত্সাহিত হইবে।