বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও ট্রান্সকম গ্রুপের চেয়ারম্যান লতিফুর রহমান আর নেই (ইন্নালিল্লাহি...রাজিউন)। গতকাল বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার চিওড়া গ্রামে নিজ বাড়ি ‘ফারাজ মঞ্জিল’-এ তিনি ইন্তেকাল করেন। প্রায় দুই বছর ধরে নানা ধরনের শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন তিনি। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, পুত্র, দুই কন্যাসহ আত্মীয়স্বজন ও গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। বিকাল ৫টা ৪০ মিনিটে লতিফুর রহমানের মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স ঢাকার উদ্দেশে রওনা হয়। রাত পৌনে ৯টায় মরদেহ গুলশানের বাসভবনে পৌঁছায়। রাত সাড়ে ৯টায় গুলশান আজাদ মসজিদে তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। রাত ১০টায় বনানী কবরস্থানে ছোট মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমানের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন লতিফুর রহমান।
মরহুম লতিফুর রহমান দৈনিক প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের মালিক। আন্তর্জাতিক ফুড চেইন পিত্জা হাট ও কেএফসি, পেপসি এবং ফিলিপসের বাংলাদেশে ফ্রাঞ্চাইজির মালিক ছিলেন তিনি। এছাড়াও তিনি নেসলে বাংলাদেশ, হোলসিম বাংলাদেশ, এসকেএফ এবং ন্যাশনাল হাউজিং ফাইন্যান্স ও ইনভেস্টমেন্টের চেয়ারম্যান। তিনি লিন্ডে বাংলাদেশ এবং ব্র্যাকের গভর্নিং বোর্ডেরও পরিচালক ছিলেন।
২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে নৃশংস জঙ্গি হামলায় যে ২০ জন দেশি-বিদেশি নাগরিক প্রাণ হারান, তাদের মধ্যে ছিলেন লতিফুর রহমানের নাতি ফারাজ আইয়াজ হোসেনও। ফারাজের চলে যাওয়ার ঠিক চার বছর পূর্ণ হওয়ার দিনেই, অর্থাত্ ১ জুলাই পৃথিবী থেকে বিদায় নিলেন নানা লতিফুর রহমান। লতিফুর রহমানের মেয়ে শাজনীন তাসনিম রহমান ১৯৯৮ সালের ২৩ এপ্রিল রাতে গুলশানে নিজ বাড়িতে খুন হন।
লতিফুর রহমানের জন্ম জলপাইগুড়িতে, ১৯৪৫ সালের ২৮ আগস্ট। তিনি চিওড়া গ্রামের প্রয়াত খান বাহাদুর মজিবুর রহমানের ছেলে। ঢাকায় থাকতেন গেন্ডারিয়ায়। পড়াশোনার শুরু সেন্ট ফ্রান্সিস স্কুলে। সেখান থেকে ১৯৫৬ সালে শিলংয়ের সেন্ট এডমন্ডস স্কুলে পড়ালেখা করেন। তারপর কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজে। ১৯৬৫ সালে ঢাকায় ফিরে আসেন লতিফুর রহমান। ঢাকায় এসে ১৯৬৬ সালে ডব্লিউ রহমান জুট মিল ট্রেইনি হিসেবে কাজ শুরু করেন। দেড় বছর কাজ শেখার পর নির্বাহী হিসেবে যোগ দেন। এভাবে কাজ করেন ১৯৭১ সাল পর্যন্ত। ১৯৭২ সালে তিনি সবকিছু নতুন করে শুরু করেছিলেন প্রায় শূন্য হাতে। ২০১২ সালে তিনি পান মর্যাদাপূর্ণ বিজনেস ফর পিস অ্যাওয়ার্ড।
মরহুমের ভাতিজা শাহিদুর রহমানের উদ্ধৃতি দিয়ে ইত্তেফাকের কুমিল্লা প্রতিনিধি/চৌদ্দগ্রাম সংবাদদাতা জানান, অসুস্থ হয়ে লতিফুর রহমান ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে গ্রামের বাড়ি ফারাজ মঞ্জিলে অবস্থান করছিলেন। মাঝে-মধ্যে ঢাকা থেকে চিকিত্সক এসে চিকিত্সার বিষয়টি তদারকি করতেন। মৃত্যুর সময় তার স্ত্রী শাহনাজ রহমান, ছেলে আসাদ অলিউর রহমানসহ পরিবারের অন্যা সদস্যরা পাশে ছিলেন। চৌদ্দগ্রাম থানার ওসি আবদুল্লাহ আল-মাহফুজ জানান, মৃত্যুর খবর পেয়ে তারা সেখানে যান। এছাড়াও সেখানে প্রশাসনের কর্মকর্তা, মিডিয়াকর্মী ও এলাকার লোকজন সমবেত হন। পরিবারের সদস্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এলাকায় জানাজা হয়নি। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান একরামুল হক জানান, উঁচু প্রাচীরঘেরা ফারাজ মঞ্জিল ছিল বেশ সুরক্ষিত।
শোক
লতিফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। শোকবার্তায় অর্থমন্ত্রী দেশের অর্থনীতিতে মরহুমের অবদানের কথা স্মরণ করেন। পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, তথ্যমন্ত্রী হাছান মাহমুদ, বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ, তথ্য প্রতিমন্ত্রী ডা. মুরাদ হাসান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডা. মো. এনামুর রহমান, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী জাহিদ ফারুক ও একই মন্ত্রণালয়ের উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীমও গভীর শোক জানিয়েছেন। পৃথক শোকবাণীতে তারা মরহুমের শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র আতিকুল ইসলামও শোক জানিয়েছেন।
জাতীয় পার্টি-জেপি চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও সাধারণ সম্পাদক শেখ শহীদুল ইসলাম এক যুক্ত শোকবাণীতে লতিফুর রহমানের মৃত্যুতে গভীর শোক জানিয়ে বলেন, তার মৃত্যুতে দেশ একজন সফল শিল্প উদ্যোক্তাকে হারাল।
বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর লতিফুর রহমানের মৃত্যতে শোক জানিয়েছেন। এছাড়া শোক জানান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী। বিএনপির সিনিয়র যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাঠানো শোকবার্তায় জানানো হয়, বিএনপির মহাসচিব ছাড়াও দলটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান লতিফুর রহমানের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন।
জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান জি এম কাদের, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন ও সাধারণ সম্পাদক ফজলে হোসেন বাদশা, জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ রেজাউল করীম পীরসাহেব চরমোনাই পৃথক শোকবার্তায় শোক জানান।
দেশের ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের পরিচালকের দায়িত্বও পালন করেছেন শিল্পপতি লতিফুর রহমান। তার মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন সংগঠনটির বর্তমান সভাপতি শেখ ফজলে ফাহিম। শোকবার্তায় তিনি বলেছেন, লতিফুর রহমানের মৃত্যু দেশ ও জাতির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। শোক জানিয়েছেন ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি-ডিসিসিআই সভাপতি শামস মাহমুদ, বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্টের (বিল্ড) চেয়ারপারসন আবুল কাসেম খান ও ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য-কর্মীরা এবং আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ-অ্যামচেম। গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। শোক জানান প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী। বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানও শোক জানিয়েছেন।