গারো কারু ও চারু শিল্প পুনরুজ্জীবনে মুনমুনের লড়াই

বন থেকে রাস্তা শুরু। বনে গিয়েই শেষ। মাঝখানে বেদুরিয়া। মধুপুর বনাঞ্চলের এ গ্রামে শুধুই গারোদের বসবাস। গ্রামের তরুণী মুনমুন নকরেক। বিলুপ্তপ্রায় গারো কারু ও চারু শিল্প পুনরুজ্জীবনের লড়াইয়ে নেমেছেন। লড়াইটা কঠিন। সামলাচ্ছেন একাই। মুনমুনের মা রোজী নকরেক। বাবা অনন্ত চিছাম। বাবা-মার সঙ্গে চার ভাইবোন এক সময় দিনমজুরি করতেন। স্বাভাবিকভাবে পড়ালেখার খরচ জোগানো ছিল কঠিন। মুনমুন বহুকষ্টে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে মাস্টার্স করেন। তার সব ভাবনা ছিল নিজের শেকড়কে ঘিরে। তাই চাকরি নয়, নিজ পায়ে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুনমুন জানান, বন উজাড়ের পরিপ্রেক্ষিতে গারোদের চিরায়ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা সংকটাপন্ন। ঐতিহ্যবাহী কারু ও চারু শিল্প বিলুপ্তপ্রায়। এ নন্দনতাত্ত্বিক শিল্পকে ক্ষুদ্র অর্থনীতির মোড়কে নিয়ে এর পুনরুজ্জীবন জরুরি। বাকিটা মুনমুনের মুখেই শোনা যাক।

‘২০১৮ সালে নকরেক আইটি থেকে অনলাইনে গ্রাফিক্স ডিজাইনের কোর্স করলাম। ছোট বোন নিঝুমকে হালুয়াঘাটের আসকিপাড়ায় গারো কারু ও চারু শিল্পে প্রশিক্ষণে পাঠালাম। ব্যাংক ঋণে বাড়িতে চালু হলো খুন্তা টান বা গারো তাঁত। গারো রমণীরা সুপ্রাচীনকাল থেকেই দকমান্দা, গান্না-বারা, দকসারি, বাটরেং ও খুটুপ পরিধান করেন। এ সব আসে ভারত থেকে। কিন্তু এখন নিজের প্রতিষ্ঠান ‘আপসান’ এর কারখানার দক্ষ কর্মীর নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে এসব। অনলাইনেই বিক্রি হচ্ছে টেকসই, আপডেটেড ও ফ্যাসনেবল পোশাক। গারো পোশাক ছাড়াও নিজস্ব ডিজাইন ও আইডিয়ায় টি-শার্ট, জামা, পাঞ্জাবি, ফতুয়া, কুর্তা, কোটি, মাফলার, উত্তরীয়, ওড়না, কুশন কভার, গামছাসহ আপসান ব্রান্ডে তৈরি হচ্ছে বাহারী পণ্য। বুনন কুশলের নিজস্ব স্টাইল ও নকসার কেতাদুরস্ত পোশাক প্রিয় তরুণদের এখন ‘ফিউশন’। পোশাক ছাড়াও মগের সরাচিত্রে, ব্লাউজ টপসে, কাঠের গয়নায়, পুঁতি মালায়, গারো মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্টে, বাঁশ ও বেতের সৌখিন পণ্যে থাকছে আরণ্যক চিত্র ও অলংকরণ। আমেরিকা, কানাডা, ফ্রান্স, ইতালি, চীন, জাপান, অস্ট্রেলিয়াসহ ১১ দেশে যাচ্ছে আপসান ব্র্যান্ডের পণ্য।’

ছোট বোন নিঝুম জানান,  হাতে তৈরি পণ্যের মার্কেট দিন দিন বাড়ছে। লাভের মুখও দেখছি। মা রোজী নকরেক জানান, অনটনের সংসারে মেয়েরা দিনমজুরি করত। সেদ্ধ বন আলু খেয়ে আধপেটা হয়ে স্কুলে যেত। এখন দিন বদলেছে। সংসারে সচ্ছলতা এসেছে। ছোট ছেলে আপসান ভার্সিটিতে পড়ে। নিঝুম গ্র্যাজুয়েশন নিচ্ছে। আচিকমিচিক সোসাইটির সভাপতি সুলেখা ম্রং জানান, গারোদের হারিয়ে যাওয়া কারু ও চারু শিল্পকে নতুন ধারায় ফিরিয়েছে মুনমুন। নকরেক আইটির সুবীর নকরেক জানান, আপসান পণ্য গুণেমানে অনন্য। মুনমুন এখন গারো রমণীদের আইকন। গারো নেতা বাবুল ডি নকরেক জানান, শেকড় সন্ধানের লড়াইটা ছিল মুনমুনের একার, কিন্তু  এখন চ্যালেঞ্জটা সবার।