চাঁদের অদেখা দূরতম পৃষ্ঠে সফলভাবে অবতরণ করেছে চীনের রোবোটিক মহাকাশযান চাং’ই-৪। বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ের স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ২৬ মিনিটে চীনের ন্যাশনাল স্পেস এডমিনিস্ট্রেশন (সিএনএসএ) পরিচালিত মনুষ্যবিহীন চাং’ই-৪ চাঁদের দক্ষিণ মেরুর এইটকেন বেসিন স্পর্শ করে বলে জানিয়েছে চীনা সেন্ট্রাল টেলিভিশন (সিসিটিভি)। পৃথিবী থেকে চাঁদের এই অংশকে দেখা যায় না বলে এটিকে ‘অন্ধকার পৃষ্ঠ’ বা ‘ডার্ক সাইড’ বলা হয়ে থাকে। চাঁদের এই অংশকে অন্ধকার পৃষ্ঠ বলা হলেও এটি বাস্তবে মোটেও অন্ধকার পৃষ্ঠ নয়, পৃথিবীর দিকে মুখ করে থাকা অংশে যে পরিমাণ আলো পড়ে সেই পরিমাণ আলো দূরতম অংশেও পড়ে।
পৃথিবীর দিকে মুখ করা চাঁদের অংশে এর আগে অসংখ্য মহাকাশযান ও নভোচারী নামলেও দূরতম পৃষ্ঠে এটিই প্রথম অভিযান। এ কারণে চাং’ই-৪ এর সফল অবতরণকে চীনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক মনে করা হচ্ছে। ১.৫ মিটার (৫ ফুট) লম্বা এবং ১ মিটারের মতো (৩.৩ ফুট) চওড়া এবং উচ্চতার এই মহাকাশযানটিতে রয়েছে গুটিয়ে রাখতে সক্ষম এমন দুটি সোলার প্যানেল এবং ছয়টি চাকা। চাং’ই-৪ এর ডিজাইনার সান জেঝোউ জানান, চাঁদের পৃষ্ঠ থেকে ১৫ কিলোমিটার উপরে অবস্থিত একটি উপবৃত্তাকার কক্ষপথ থেকে এটি চূড়ান্ত অবতরণ করে দক্ষিণ মেরুর এইটকেন বেসিনে। চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, সেখান থেকে চাং’ই-৪ চাঁদের অজানা অংশের একটি ছবিও পাঠিয়েছে। তবে এ মহাকাশযানটির সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সরাসরি কোনো সংযোগ না থাকায় চাং’ই-৪ ছবি ও তথ্য পাঠানোর জন্য একটি কৃত্রিম উপগ্রহের সাহায্য নিয়েছে। চাং’ই-৪ প্রথমে ছবি এবং তথ্য কৃত্রিম উপগ্রহে পাঠিয়েছে এবং সেই উপগ্রহ থেকে ছবিগুলো এসেছে পৃথিবীতে। মূলত চাঁদের ঐ অংশ পৃথিবী থেকে দূরতম দূরত্বে অবস্থিত হওয়ার কারণে সেখানে কোন বেতার তরঙ্গ নেই। আর বেতার তরঙ্গ না থাকার কারণে সরাসরি গ্রাউন্ড কন্ট্রোলারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে অক্ষম মহাকাশযানটি। চাং’ই-৪ এর সাথে যোগাযোগ স্থাপনের জন্য গত বছর বিশেষ ঐ কৃত্রিম উপগ্রহটি কক্ষপথে স্থাপন করে চীন।
গত মাসের প্রথম সপ্তাহে চীনের শিচুয়ান প্রদেশের শিচাং উপগ্রহ উেক্ষপণ কেন্দ্র থেকে মহাশূন্যে উেক্ষপণ করা হয় চাং’ই-৪ মহাকাশযানটি। আর ১২ ডিসেম্বর চাঁদের কক্ষপথে প্রবেশ করে চাং’ই-৪। এ রোবোটিক মহাকাশযানটি এইটকেন বেসিনের ভন কারমান ক্রেটার নামে একটি অংশে অনুসন্ধান চালাবে। রোবোটিক এ মহাকাশযানটি চাঁদের ওই অংশের ভূতত্ত্ব বিশ্লেষণে সক্ষম যন্ত্রপাতি নিয়ে গেছে। সেখানে বেশ কিছু অনুসন্ধান পরিচালনা করবে চাং’ই-৪ মহাকাশযানটি। সেখানে কম ফ্রিকোয়েন্সি বেতার জ্যোতিবিজ্ঞান সম্পর্কে অনুসন্ধান চালানোর পাশাপাশি কম মধ্যাকর্ষণের পরিবেশে উদ্ভিদ জন্মাতে সমক্ষম নিয়েও পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালাবে। একই সাথে সেখানে পানি কিংবা অন্যান্য উপাদান সম্পর্কেও অনুসন্ধান চালাবে মহাকাশযানটি। এই প্রকল্পের মাধ্যমে সৌর বায়ু এবং চাঁদের পৃষ্ঠের মধ্যকার মিথষ্ক্রিয়া সম্পর্কেও গবেষণা পরিচালনা করতে চান এই প্রকল্পের বিজ্ঞানীরা।
চীনা ন্যাশনাল স্পেস এডমিনিস্ট্রেশনের হয়ে কাজ করা লুনার এক্সপ্লোরেশন এন্ড স্পেস প্রোগ্রাম সেন্টারের উপ-পরিচালক টোঙঝি লিউ বলেন, চাঁদের এই দূরতম অংশটি পৃথিবীর তড়িত্ চৌম্বকীয় বলমুক্ত বলে এটি গবেষণার জন্য আদর্শ স্থান হতে পারে। সৌর বিস্ফোরণ এবং মহাকাশের পরিবেশ সম্পর্কে আরো ভালোভাবে বোঝার জন্য এই স্থানে গবেষণা করাটা দারুণ একটি বিষয় হতে পারে।-সিএনএন