কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ীতে স্বামী ও তার পরিবারের নির্যাতনের শিকার চার গৃহবধূ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন। তাদের কান্নায় হাসপাতালের প্রতিটি মানুষের চোখে পানি এসে যায়। তারা একদিকে যেমন পারছেন না স্বামী ও স্বামীর পরিবারের অত্যাচার সহ্য করতে, অন্যদিকে দরিদ্র বাবার সংসারের বোঝা হয়েও থাকতে পারছেন না। নির্যাতনের শিকার এসব গৃহবধূরা হলেন- তহমিনা বেগম (২০), হামিদা বেগম (২৬), শিল্পী বেগম (২০) ও সুমনা বেগম (১৯)। গতকাল ফুলবাড়ী উপজেলা সদর হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, তারা মহিলা ওয়ার্ডে চিকিত্সাধীন। তাদের সবার চোখে মুখে বিষাদের ছায়া। সাংবাদিক দেখেই তারা কান্নায় ভেঙে পড়েন। তারা কান্না জড়িত কণ্ঠে জানান, তাদের নির্যাতনের করুণ কাহিনী।
উপজেলার নাওডাঙ্গার তোফাজ্জল হোসেনের মেয়ে তহমিনা জানান, গত বছর ২২ মার্চ একই ইউনিয়নের জাহিদ হাসানের সঙ্গে বিয়ে হয় তার। তার ইচ্ছা ছিল পড়াশুনা শেষে চাকরি নিয়ে বিয়ে করার। দিনমজুর বাবার কারণে তার ইচ্ছা পূরণ হয়নি। দুই পরিবারের চাপে বিয়েতে রাজি হন তহমিনা। বিয়ের পরেই শুরু হয় স্বামী ও তার পরিবারের নির্যাতন। নির্যাতন ও শ্বশুরবাড়ির লোকের চাপ সহ্য করেও তহমিনা এইচএসসি পাস করে কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে ইতিহাস বিভাগে অনার্সে ভর্তি হন। তিনি বর্তমানে ২য় বর্ষের শিক্ষার্থী। স্বামীর চাপে তহমিনা ক্লাস করতে পারেননি। এরই মধ্যে বাকি যৌতুকের ৫০ হাজার টাকা দাবি করে চলে নির্যাতন। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির চাপে ঢাকা যেতে বাধ্য হন তহমিনা। স্বামীও চলে যান ঢাকায়। স্বামীর ইচ্ছায় তহমিনাও গার্মেন্টে চাকরি নেন। কিন্তু চাকরি করতে না চাইলে স্বামীর সাফ কথা, চাকরি করলে সংসার টিকবে, না করলে টিকবে না। নির্যাতন সহ্য করে অনেক কষ্টে এক বছর ধরে চাকরি করেন তহমিনা। কিন্তু কয়েকদিন আগে স্বামীর নির্যাতন সহ্য করতে না পেয়ে গোপনে চাকরি ছেড়ে ও স্বামীকে না জানিয়ে বাবার বাড়িতে আসেন তিনি। শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা। আঘাতের চিহ্ন। একই ভাবে স্বামী ও তার পরিবারের দ্বারা নির্যাতনের শিকার নাগেশ্বরী উপজেলার নাখারগঞ্জ গ্রামের হাবিবুর রহমানের মেয়ে হামিদা বেগম। পাঁচ বছর পূর্বে উপজেলার বালাতারী গ্রামের হাবু মিয়ার সঙ্গে বিয়ে হয় হামিদার। বিয়ের পরেই শুরু হয় নির্যাতন-অত্যাচার। হামিদাও স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে গত সোমবার একই হাসপাতালে ভর্তি। ঠিক একইভাবে চন্দ্রখানা বালাটারি গ্রামের ছকমল হোসেনের মেয়ে সুমনার গত ছয়মাস পূর্বে বাইদুলের সঙ্গে বিয়ে হয় । সেও গত দুইদিন পূর্বে স্বামীর নির্যাতনের শিকার হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। উপজেলার নাগদাহ গ্রামের সেকেন্দার আলীর মেয়ে শিল্পীর সঙ্গে উত্তর রাবাইতারী গ্রামের মাইদুলের সঙ্গে বিয়ে হয়। শিল্পীও নির্যাতনের শিকার হয়ে গত সোমবার হাসপাতালে ভর্তি হয়।
তহমিনার বাবা ও হামিদার বাবা মেয়ে নির্যাতনের বিচার চেয়েছেন। নাওডাঙ্গা ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য শাহজাদা খন্দকার বলেন, নির্যাতনের সঠিক বিচার হওয়া দরকার। ফুলবাড়ী উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জয়ন্তী রানী জানান, ভুক্তভোগিরা আমাকে জানালে অবশ্যই আইনি সহযোগিতা করব। সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মো. গোলাম কিবরিয়া বলেন, আহত চার গৃহবধূকে চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছে। তারা আস্তে আস্তে সুস্থ হয়ে উঠছেন। ফুলবাড়ী থানার ওসি খন্দকার ফুয়াদ রুহানী জানান, অভিযোগ পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।