রাজশাহীতে চিকিত্সা নিতে সীমাহীন দুর্ভোগ

স্টাফ রিপোর্টার, রাজশাহী

বিভাগীয় শহর রাজশাহীতে চিকিত্সা নিতে এসে ভোগান্তির শিকার হচ্ছে প্রতিদিন শত শত মানুষ। ডাক্তার সংকটের কারণে উত্তর এবং দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা চিকিত্সা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহত্ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতাল, বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার সর্বত্রই চলছে এক রকম চিকিত্সাহীনতা। 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত মার্চের শেষের দিকে লকডাউন শুরু হলে রাজশাহীর অধিকাংশ ডাক্তার চেম্বারে রোগী দেখা বন্ধ করে দেন। এই অবস্থা এখনো চলমান রয়েছে। ডাক্তার সংকটের কারণে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা রোগীরা চিকিত্সা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন। বৃহস্পতিবার সকালে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, জরুরি বিভাগের সামনে রোগীরা অবস্থান করছেন। তাদের স্বজনরা হাসপাতালে ভর্তির জন্য ছুটাছুটি করছেন। দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও রোগী ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ হচ্ছে না। শারীরিক অবস্থা খারাপ হলেও রোগী ও স্বজনদের ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ করতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে।

অপেক্ষমাণ রোগীর স্বজন নাটোরের রোজিনা খাতুন (৩৫) বলেন, তার পাঁচ বছরের ছেলে সিয়াম রক্তশূন্যতায় ভুগছে। সকাল ৯টায় হাসপাতালের জরুরি বিভাগে এসেছেন। কিন্তু বেলা ১১টা পর্যন্ত ভর্তির প্রক্রিয়া শেষ করতে পারেননি। ভর্তির সময়ই যখন এই অবস্থা, তাতে ভর্তির পর পরিপূর্ণ চিকিত্সা নিয়ে আশঙ্কার কথা বলেছেন তিনি। একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন সেখানে উপস্থিত আরো কয়েক জন রোগী।’ এ বিষয়ে জরুরি বিভাগের দায়িত্বরত (ইএমও) চিকিত্সক আরিফুল ইসলাম অবশ্য বলেছেন, ‘সবাই করোনা ভাইরাস আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন। জরুরি বিভাগে চিকিত্সক এবং ওয়ার্ড বয়দের খুব সতর্কতার সঙ্গে কাজ করতে হচ্ছে। তাই রোগী ভর্তির ক্ষেত্রে কিছুটা হলেও বিলম্ব হচ্ছে। এ কারণে তারা আগত রোগীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করেন। রোগীর স্বজনের ছদ্মবেশে ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, করোনা আতঙ্কে এবং পরিপূর্ণভাবে চিকিত্সা না পাওয়ার কারণে উত্তরাঞ্চলের সর্ববৃহত্ রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ওয়ার্ডগুলোও কার্যত রোগীশূন্য হয়ে পড়েছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত এই হাসপাতালের অন্তত ১৫/২০টি ওয়ার্ড ঘুরে ধারণক্ষমতার আংশিক রোগী চিকিত্সাধীন দেখা যায়। এসব রোগীর অধিকাংশই এক সপ্তাহ বা তার আগে থেকে ভর্তি রয়েছেন। হাজার বেডের এই হাসপাতালে ২৪ ঘণ্টায় মাত্র ৫০ জন রোগী ভর্তি হচ্ছেন বলে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে। অথচ স্বাভাবিক সময়ে এই হাসপাতালের ওয়ার্ডে রোগীদের স্থানসংকুলান হয় না। বহির্বিভাগের বিভিন্ন বিভাগে মাত্র ৫০-৫৫ জন রোগী অবস্থান করছিলেন। তাদের মধ্যে মহানগরীর উপকণ্ঠ নওহাটার ছাবের আলী বলেন, ‘কয়েক দিন থেকে কান ব্যথায় প্রচণ্ড কষ্ট পাচ্ছেন। এজন্য হাসপাতালে এসেছেন। কিন্তু ডাক্তার না থাকায় চিকিত্সা না পেয়ে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।

তবে রামেক হাসপাতালের পরিচালক ডা. সাইফুল ফেরদৌস বলেন, তারা চিকিত্সাসেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। দেশে দুর্যোগকালীন সময় চলছে। তার পরেও এই হাসপাতালের চিকিত্সক এবং সংশ্লিষ্টরা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। হয়তো কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তার পরেও তারা রোগীদের চিকিত্সাসেবা দেওয়ার চেষ্টা করছেন। অন্য দিকে রাজশাহীর বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারেও মিলছে না চিকিত্সাসেবা। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পরে নগরীর লক্ষ্মীপুরে পপুলার রাজশাহী শাখায় দেখা যায়, প্রায় সব ডাক্তারের চেম্বার বন্ধ। এদিন সন্ধ্যায় মায়ের ভাঙা পায়ের চিকিত্সার জন্য নাটোর সদর থেকে এসেছিলেন রহমত উল্লাহ (৩৫)। ভেবেছিলেন রাজশাহীর কোনো প্রাইভেট হাসপাতাল বা ক্লিনিকে ডাক্তার দেখাবেন। কিন্তু পপুলার, রয়েল ও ইসলামী ব্যাংক হাসপাতাল ঘুরে অর্থপেডিক্সের কোনো ডাক্তার পাননি। এ ব্যাপারে বাংলাদেশ ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন রাজশাহী জেলার সহসভাপতি ফয়সাল কবীর চৌধুরী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে অনেক ডাক্তারই বেসরকারি হাসপাতাল এবং ক্লিনিকগুলোতে আসতে অনীহা দেখাচ্ছেন। ফলে রোগীরা ফিরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।