রেজাউল করিম খোকন
করোনা মহামারির ভয়াবহ প্রকোপে গোটা বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও স্থবিরতা নেমে এসেছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প উত্পাদন, বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড হ্রাস পেয়েছে করোনার কারণে। করোনার প্রভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। এর প্রভাবে ব্যবসা, বাণিজ্য, পর্যটন, বিনোদন, যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাংক ও বীমা খাত সংকুচিত হয়ে এবং কলকারখানার উত্পাদন আগের চেয়ে আশঙ্কাজনকভাবে কমে অর্থনীতিতে চরম হুমকি সৃষ্টি করেছে। যার প্রতিঘাত হিসেবে প্রতিদিন অগণিত মানুষ বেকার হয়ে পড়ছে। করোনার প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে এর মধ্যেই। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্প ও বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের পাঠানো অর্থ দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রাণসঞ্চার করে এলেও এখন করোনার কারণে ঐ দুই খাতেই চরম বিপর্যয় নেমে এসেছে।
প্রতিদিন হাজার হাজার শ্রমিক বেকার হয়ে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। করোনার ভয়াবহ প্রকোপে নিম্ন-আয়ের মানুষ যতটা বিপদে আছে, তার চেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ। অনেকের চাকরি নেই, হাতের জমানো টাকাও শেষ। সরকারের করোনাকালীন বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচির তালিকায় দরিদ্র মানুষ নাম ওঠাতে পারলেও মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত কারো কাছে হাত পাততে পারছেন না। এ অবস্থায় আবারও গ্রামমুখী হচ্ছেন তারা, ঈদুল আজহার বাকি রয়েছে প্রায় এক মাস। সাধারণত ঈদের আগে মানুষের শহর ছেড়ে গ্রামে যাওয়ার দৃশ্য চোখে পড়লেও করোনা এসব নগরবাসীকে এখনো বাধ্য করছে স্থায়ীভাবে গ্রামে ফিরে যেতে। পিকআপ, ভ্যানগাড়ি বা ট্রাকে মালামাল নিয়ে পরিবারসহ গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাওয়ার চিত্র এখন শহরজুড়ে। কেউবা আর্থিক সঙ্গতি কমে যাওয়ায় বড় ফ্ল্যাট ছেড়ে দিয়ে ছোট ফ্ল্যাট বা সাবলেটে ভাড়া থাকার চেষ্টা করছেন। যারা এখনো যাননি তারাও প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাওয়ার। জানা গেছে, সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ও আউটসোর্সিং ভিত্তিতে নিয়োজিত কর্মচারীদের অনেকে গত কয়েক মাস ধরে নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। কাউকে বাধ্যতামূলক ছুটি দেওয়া হয়েছে। অনেক প্রতিষ্ঠানে কর্মী ছাঁটাইও করা হয়েছে। এছাড়া বাসাবাড়িতে ও মেসে গৃহকর্মীদের কাজে না রাখার কারণে তারা কর্মহীন, বেকার হয়ে খালি হাতে গ্রামে ফিরে যাচ্ছেন। ফুটপাতের ব্যবসায়ী ও হকারদের পণ্য বিক্রির সুযোগ কমে যাওয়ায় তারাও বিপাকে পড়েছেন। বিভিন্ন জরিপ অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনা ভাইরাসের প্রভাবে দেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১০ কোটি মানুষ আর্থিকভাবে হুমকিতে পড়েছেন।
বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে করোনার কারণে বিপর্যস্ত অর্থনীতির সংকট কাটাতে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ১১৭ কোটি টাকার ১৮টি প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। কিন্তু অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতামত হলো—ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড এবং শিল্পপণ্য উত্পাদন ব্যবস্থা আগের মতো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত এ রকম স্থবিরতা রয়ে যাবে। সরকারি প্রণোদনা বিতরণের ক্ষেত্রে শ্রমঘন শিল্পের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অগ্রাধিকার দিতে হবে এবং এই উদ্যোক্তারা তাদের ব্যবসা আবার শুরু করতে পারলে তাতে কর্মসংস্থানের গতি ফিরে আসবে।
করোনার প্রকোপে ব্যবসা-বাণিজ্য ছেড়ে, চাকরি ও কাজ হারিয়ে যারা শহর ছেড়ে গ্রামে গেছেন কিংবা যাচ্ছেন, তাদের ভবিষ্যত্ জীবিকা হবে কৃষিনির্ভর। তাই তাদের সহজশর্তে ঋণ দিতে হবে। কৃষিপণ্যকে আধুনিক বাণিজ্যিক ব্যবস্থায় নিতে পারলে কৃষকরা সবচেয়ে বেশি লাভবান হবেন। যদিও বাংলাদেশে এটা খুবই কম। বর্তমানে আধুনিক কৃষিপণ্যের বাজার ১ দশমিক ৬ শতাংশ। এটা যদি ৪০ শতাংশে উন্নীত করা যায় তাহলে ১ লাখ সুপারস্টোর বা সুপারশপ আধুনিক ব্যবসায় চলে আসবে। তখন দেশের গ্রামাঞ্চল ও শহরে অতিরিক্ত ১২ লাখ মানুষের কর্মস্থান সৃষ্টি হবে। গ্রামে নতুন উদ্যোক্তা ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির চমত্কার সম্ভাবনা রয়েছে।
বর্তমানে সরকার ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল তৈরি করেছে দেশ জুড়ে। এখানে শ্রমঘন শিল্প, বিশেষ করে পোশাক খাতের জন্যও বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। এসব অর্থনৈতিক অঞ্চলে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান তৈরির বিশেষ সুযোগ রয়েছে। শহরের সুযোগ-সুবিধা গ্রামে নিয়ে যাওয়ার জন্য ‘আমার গ্রাম আমার গ্রাম’ প্রকল্পের সূচনা করা হয়েছে। এর মাধ্যমেও গ্রামাঞ্চলে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নতুনভাবে সৃষ্টি করে গোটা অর্থনীতিতে বিদ্যমান স্থবিরতা দূর করা সম্ভব। গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন জোয়ার সৃষ্টির মাধ্যমে করোনার প্রভাবে স্থবির অর্থনীতিকে সচল করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের বিকল্প নেই। ‘সবকিছুই সরকার করবেন’—তেমন চিন্তাভাবনা, ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল থাকার মানসিকতা ত্যাগ করে সাধ্যমতো সবাইকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবিরাম কাজ করে যেতে হবে।
n লেখক :ব্যাংকার