একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম ও কারচুপির অভিযোগ এনে ফলাফল বাতিলের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) স্মারকলিপি দিয়েছেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতারা। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদার সঙ্গে সাক্ষাত্ করে এ স্মারকলিপি দেন তারা। পরে মির্জা ফখরুল ইসলাম জানান, স্মারকলিপিতে তারা নির্বাচনের অনিয়মের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেছেন। পাঁচটি ফাইল জমা দিয়েছেন। আরও তথ্য-উপাত্ত কমিশনে জমা দেবেন। পাশাপাশি নির্বাচনী ট্রাইব্যুনালে মামলাও দায়ের করবেন। তিনি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে পুনরায় নির্বাচন করার দাবি জানান।
স্মারকলিপিতে ঐক্যফ্রন্ট অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের আগের রাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের সহায়তার আওয়ামী লীগের কর্মী ও সন্ত্রাসী বাহিনী ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট কেটে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে। এ অবস্থায় ভোটের ফল বাতিল করে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নতুন করে নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি জানানো হয়েছে জোটের পক্ষ থেকে।
বৃহস্পতিবার বিকাল ৩টার পরপরই সিইসির রুমে যান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, নির্বাচন পরিচালনা কমিটির প্রধান ও দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের কার্যকরি সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত রায় চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসীন মন্টু প্রমুখ। তবে গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন ইসিতে আসেননি। প্রায় আধ ঘন্টার বৈঠক শেষে তারা সিইসির কাছে স্মারকলিপি জমা দেন। পরে সাংবাদিকদের ব্রিফিং করেন জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
মির্জা ফখরুল বলেন, মাঠ পর্যায়ের কোনো স্তরেই নিয়ন্ত্রণ ছিল না নির্বাচন কমিশনের, একজন কমিশনারের বক্তব্যে তা প্রমাণ হয়েছে। দীর্ঘ দশ বছর ভোটাধিকার বঞ্চিত জনগণকে প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে আবারও বঞ্চিত করার দায় নির্বাচন কমিশনকেই বহন করতে হবে। নির্বাচনের অনিয়মের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যালট পেপারের মুড়িতে ভোটারের সই বা টিপ সই লাগে। আপনারা দেখেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তা নেই। কেননা নির্বাচনের আগের রাতেই ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট কেটে ব্যালট বাক্সে ভরে রাখা হয়েছে। ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের আসতে বাধা দেওয়া হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। নির্বাচনের আগের দিন ও রাতে পোলিং এজেন্ট এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের নানারকম হুমকি দেওয়া হয়, গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে এলাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়। ক্ষেত্রেবিশেষে ভোটকেন্দ্রে আসলেও এজেন্টদের বের করে দেওয়া হয়।
ফখরুল আরও বলেন, প্রায় সকল কেন্দ্রেই দুপুরের মধ্যে ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যায়। পরে মধ্যাহ্ন বিরতির নামে ভোটকেন্দ্রের মূল ফটক বন্ধ করে দেওয়া হয়। নজিরবিহীনভাবে বিচারিক ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের নিস্ক্রিয় করে রাখা হয়। অনেক কেন্দ্রে ১০০ শতাংশ ভোট কাস্ট হয়, যা অবাস্তব। নির্বাচনে দলীয় ব্যক্তিদের ভোটগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। অনেক ভোটকেন্দ্রেই বিকাল ৪টার আগেই ভোটগণনা শুরু হয়। সারাদেশে জালভোটের মহোত্সব চললেও কোথাও একজন জালভোট প্রদানকারীকেও গ্রেফতার করা হয়নি।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, নির্বাচন কমিশন এ নির্বাচনের মাধ্যমে জাতির সঙ্গে মকারি (উপহাস) করেছে। জাতিকে অন্ধকারে দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এজন্যই প্রত্যাখ্যান করেছি। পুনর্নির্বাচনের জোর দাবি জানাচ্ছি। এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে ইসি কী বলছে, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তারা শুধু স্মারকলিপি গ্রহণ করেছে। তাদের কোনো কথা নেইতো।
ঐক্যফ্রন্টের জয়ীরা শপথ নেবেন কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমরা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছি। শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসবে কেন? যেখানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন সেখানে কারচুপি হয়েছে কিনা-এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, সেগুলোতেও ডাকাতি হয়েছে, তবে তারা কুলিয়ে উঠতে পারেনি।
আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচন (দশম সংসদ নির্বাচন) বর্জন করেছিলাম, সেটাই সঠিক, তা প্রমাণ হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে কোনো নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আগামীতে কি কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে তা পরে জানবেন।
স্মারকলিপিতে যেসব ক্যাটাগরিতে অভিযোগ করা হয়েছে সেগুলো হলো-তফসিল ঘোষণায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা, ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের (প্রিজাইডিং, সহকারি প্রিজাইডিং ও পোলিং কর্মকর্তা) আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক ভেটিং ও হয়রানি, দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের অজ্ঞাত স্থান থেকে টেলিফোনে ভয় দেখানো, মনোনয়নপত্র বাছাই ও আপিলে রিটার্নিং কর্মকর্তা-ইসির রহস্যজনক ভূমিকা। অভিযোগে আরও রয়েছে- নেতাকর্মীদের গায়েবি মামলা ও হয়রানি, প্রার্থীদের গ্রেফতার ও আটক, পর্যবেক্ষকদের নিরুত্সাহিত করা, প্রচারে বাধা দেয়া, সাজানো প্রশাসন ও পুলিশের রদবদল না করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা এবং সেনাসদস্যদের নিষ্ক্রিয় করে রাখা। এ স্মারকলিপিতে ভোটের দিনের অনিয়মের ১৭ ধরনের অভিযোগ করা হয়েছে।