করোনার কারণে এ ধরনের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ আছে

সংস্কৃতিকর্মীরা কর্মহীন ভুগছেন অর্থকষ্টে

সামাজিক বিধি মেনে করোনাকালের ‘নিউ নরমাল লাইফে’ অভ্যস্ত হয়ে উঠছে জনজীবন। সবকিছু স্বাভাবিক হতে শুরু করলেও দেশের সংস্কৃতি অঙ্গন এখনো স্থবির। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান একেবারেই বন্ধ। এর ফলে সংস্কৃতিকর্মী ও এসব সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত কলাকুশলীদের দিন কাটছে হতাশায়, চরম আর্থিক অনটনে।

দেশের যে কোনো রাজনৈতিক আন্দোলনে সাংস্কৃতিক কর্মীরাই সবার আগে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলেন, অথচ যখন আন্দোলন শেষ হয় তখন তারাই উপেক্ষিত থেকে যান। করোনাকালেও সেই একই পরিস্থিতির শিকার সংস্কৃতিকর্মীরা। এমনকি অনেক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব যারা বিজ্ঞাপন ব্যবসা ও করপোরেট ঠিকাদারির সঙ্গে যুক্ত তাদেরও এসময় কোনো তত্পরতা চোখে পড়ছে না।

এদিকে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর জোটভিত্তিক মঞ্চ থেকে তৃণমূল পর্যায়ে কিছু কিছু সহযোগিতা করা হয়েছে বলে জানা গেছে। অনেক শিল্পী ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন কলাকুশলীদের সহযোগিতা করছেন। আর সরকারিভাবে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সারাদেশের মাত্র ৫ হাজার শিল্পীকে এককালীন ৫ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। এত সামান্য অর্থ এবং এত কম মানুষের মাঝে বিতরণের ফলে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়।           এ প্রসঙ্গে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ ইত্তেফাককে বলেন, সারাদেশের কমপক্ষে ১ লাখ কলাকুশলীকে সহযোগিতা দেওয়া জরুরি। সংস্কৃতিকর্মীরা আজ বিপন্ন, কর্মহীন। বিশেষ করে যন্ত্রশিল্পীরা। আমরা সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী, তথ্যমন্ত্রী সবাইকে এ প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছি। কিন্তু করোনাকালের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ইতিবাচক কোনো উদ্যোগ নজরে আসেনি। তিনি বলেন, এককালীন ৫ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। এতে কিছুই হয় না। প্রতি মাসে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা দেওয়ার দাবি জানান তিনি।

শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী ইত্তেফাককে জানান, এককালীন এবং পরবর্তী সময়ে বাউল শিল্পীসহ দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে নানা পর্যায়ের শিল্পীদের সহযোগিতা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। সেই সঙ্গে সারাদেশের শিল্পী, যন্ত্রশিল্পীসহ কলাকুশলীদের সহযোগিতা করতে স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প করা হয়েছে। যা শিগিগরই মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হবে।

অনলাইনে কিছু গানের অনুষ্ঠান হলেও নাটক, আবৃত্তিসহ সকল ধরনের অনুষ্ঠান পুরোপুরি বন্ধ। শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চগুলো জনমানবশূন্য। শহিদ মিনার, টিএসসি, শাহবাগ প্রতিটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রই নির্জন, সুনসান। করোনার ছোবলে একেবারেই থমকে গেছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। শুধু তাই নয়, টিভিতে যেসব নাটক প্রচারিত হয় থমকে গেছে সেসবের শুটিং। এ পরিস্থিতিতে শিল্পী কলাকুশলীরাও রয়েছেন মহাসংকটে।

মে মাসে প্রতি জেলা থেকে ৫০ জন আর ঢাকা মহানগর থেকে ১ হাজার ৫০০ জনকে এককালীন ৫ হাজার টাকা করে অর্থসহায়তা দেয় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়। পরবর্তী পর্যায়ে প্রয়োজনে আরো সহযোগিতা বাড়ানো হবে বলা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা প্রদান প্রসঙ্গে লিয়াকত আলী লাকী জানান, দ্বিতীয় পর্যায়েও এই সহযোগিতা দেওয়া শুরু হয়েছে। এর বাইরেও শিল্পকলা একাডেমির মাধ্যমে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সহযোগিতা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কুষ্টিয়ার শতাধিক বাউলকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি যাত্রাশিল্পী, পুতুল নাট্যশিল্পী, যন্ত্রীদের আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এছাড়া গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশানের প্রতিটি দলকে মাসিকভাবে অর্থ দেওয়া হচ্ছে যাতে তাদের দলের কেউ বিপন্ন হলে তাদের তাত্ক্ষণিকভাবে সহায়তা দেওয়া হয়। তিনি জানান, দেশ জুড়েই শিল্পকলা একাডেমি শিল্পীদের সহযোগিতা করতে সামাজিক বিধি মেনেই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করবে। এতে শিল্পী ও কলাকুশলীদের সম্মানি দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। যাতে তাদের কিছুটা আর্থিক সহযোগিতা দেওয়া যায়।

বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি শিল্পী ফকির আলমগীর বলেন, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের ৫০ জন শিল্পীকে এককালীন অর্থসহায়তা করা হয়েছে। এটা আমরা ব্যক্তিগতভাবে করেছি। এছাড়া বিভিন্ন শিল্পীর অনুদানও নেওয়া হয়েছে। তবে দুস্থ শিল্পীদের সহযোগিতার জন্য সরকারি কোনো সহযোগিতা পাননি বলে তিনি জানান।