একাদশ জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসতে আগ্রহী নন এইচএম এরশাদের জাতীয় পার্টির (জাপা) নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা। গতকাল বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে শপথ গ্রহণের পর দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে দলটির এমপিদের প্রায় সবাই অভিন্ন ভাষায় বলেছেন- জাপা আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক, একসঙ্গে নির্বাচন ও বিজয়ী হলে সরকার গঠনের লক্ষ্যেই মহাজোট গঠন করা হয়েছিল, ভোটারদের কাছে তারা ভোটও চেয়েছেন মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে। দেশের জনগণ যেহেতু মহাজোটকে সরকার গঠনের জন্য রায় দিয়েছে, সেই কারণে মহাজোটের সরকার হবে এবং জোটের শরিক হিসেবে জাপা সরকারেই থাকবে। বিরোধী দলের আসনে বসার জন্য জনগণ জাপাকে ভোট দেয়নি যুক্তি দেখিয়ে দলটির এমপিরা বৈঠকে এ-ও বলেছেন, এখন বিরোধী দলে কারা বসবেন সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা সরকারি দল নির্ধারণ করবে।
জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে সংসদ ভবনের শপথ কক্ষে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলের অন্য শরিক দলের সংসদ সদস্যদের শপথের পর দুপুর সোয়া ১২টার দিকে শপথ নেন জাপার এমপিরা। দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাপা এমপিরা শপথ নেন। তবে রংপুর-৩ আসন থেকে নির্বাচিত জাপা চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ অসুস্থতার কারণে গতকাল শপথ নিতে যেতে পারেননি। রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ সূত্র ও জাপার একাধিক সংসদ সদস্য ইত্তেফাককে জানান, বুধবার রাতে এরশাদকে ফোন করে গতকাল একসাথে শপথ নিতে বলেছিলেন রওশন। তখন এরশাদ তাকে বলেছেন, ‘আমাকে তো হুইল চেয়ারে করে শপথ নিতে যেতে হবে। অনেকে এটা দেখবে, আমার কাছে ভালো লাগবে না। বরং সবাই শপথ নিয়ে চলে যাওয়ার পর বিকাল তিনটার দিকে আমি একা গিয়ে স্পিকারের কক্ষে শপথ নিয়ে আসবো।’ তবে গতকাল দুপুরে সংসদ ভবন থেকে রওশন ও এরশাদের ছোট ভাই জিএম কাদের শপথ নিতে আসার জন্য এরশাদকে ফোন করলে তিনি তাদেরকে জানান, তার শরীর ভালো লাগছে না, পরে একদিন গিয়ে তিনি শপথ নেবেন।
শপথ শেষে সংসদ ভবনে দশম সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে রওশন এরশাদের কার্যালয়ে দলের পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে বসেন জাপার এমপিরা। রওশনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে এরশাদ ছাড়া দলটির অন্য ২১ জন এমপি উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে রওশন এরশাদ ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমরা মহাজোট করেছি, মহাজোটের সঙ্গে সরকারে থাকারই চিন্তা-ভাবনা করছি। এখন পার্টির চেয়ারম্যানের (এরশাদের) সঙ্গে আলোচনা করে আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আজকের বৈঠকে জাপার সংসদীয় দলের নেতা নির্ধারণ করা হয়নি। আমিও হতে পারি, সেই সম্ভাবনা তো আছেই।’
রওশন বলেন, ‘আমাদের বেশিরভাগ এমপিই মত দিয়েছেন যে, মহাজোটের শরিক হিসেবে আমরা যেন সরকারেই থাকি। এটাই আমাদের আজকের বৈঠকের সিদ্ধান্ত।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা সরকারে থাকলে বিরোধী দলের আসনে কারা বসবে সেটা প্রধানমন্ত্রী ঠিক করবেন।’
বৈঠকের পর জাপার কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের ইত্তেফাককে বলেন, ‘বৈঠকে আমাদের সব এমপির মত হচ্ছে, যেহেতু আমরা মহাজোটগত নির্বাচন করেছি একসঙ্গে সরকার গঠনের জন্য, আওয়ামী লীগ-জাপার নেতা-কর্মীরা একসঙ্গে কাজ করেছে, তারা জনগণের কাছে অভিন্ন লক্ষ্যে ভোট চেয়েছেন, তাই সঙ্গত কারণেই আমরা এখন মহাজোটের সরকারেই থাকতে চাই। বিএনপি এত কম আসন পাবে এটা আমাদের কারও ধারণায় ছিল না। বৈঠকে সবাই একটা বিষয়ে একমত, আমরা সরকারেই থাকতে চাই। দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আওয়ামী লীগসহ আমরা একসাথে নেতৃত্ব দেব, একথা বলেই তো আমরা ভোট চেয়েছি। জনগণও মহাজোটকে সরকার গঠনের জন্য রায় দিয়েছে। আওয়ামী লীগের বিরোধী পক্ষ হিসেবে তো আমরা ভোট চাইনি। জনগণও আমাদেরকে বিরোধী দলে যাওয়ার জন্য ভোট দেয়নি। সেই কারণেই আমরা সরকারে থাকার কথা বলছি। এটা আমাদের দলীয় অবস্থান।’
এক প্রশ্নের জবাবে জিএম কাদের বলেন, ‘জাপা সরকারে থাকলে বিরোধী দলে কারা বসবেন সেটা দেখার দায়িত্ব আমাদের নয়। অন্য কে কী হবে সেটা আমাদের ভাবনার বিষয়ও নয়।’ তিনি জানান, জাপার পার্লামেন্টারি পার্টির একটি প্রতিনিধি দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময় পাওয়া সাপেক্ষে তার সঙ্গে দেখা করবেন। তখন এসব বিষয়ে আলোচনা হবে।
শপথ গ্রহণ ও পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক শেষে সংসদ ভবন থেকে বের হওয়ার সময় জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমরা তো সরকারে থাকতে চাই। এখন প্রধানমন্ত্রী চাইলে বিরোধী দলেও আমাদের পাঠাতে পারেন। প্রধানমন্ত্রী যেটা ভালো মনে করেন আমরা সেটাই করবো।’ বৈঠক শেষে নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসন থেকে পুনরায় নির্বাচিত জাপার এমপি লিয়াকত হোসেন খোকা ইত্তেফাককে বলেন, ‘এবারের নির্বাচনে দেশবাসী এক হয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় দেশকে সামনে এগিয়ে নিতে মহাজোটকে ভোট দিয়েছে, ২৮৮টি আসন দিয়ে মহাজোটকে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েছে। জনগণ তো বিরোধী দল চায় না, চাইলে মহাজোটের বিরোধী পক্ষকেও ভোট দিত। সেই কারণে মহাজোটের সরকার গঠন হোক, এটাই দেশবাসী দেখতে চায়।’
এদিকে, কয়েকটি ইস্যুতে জাপার পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে বাহাসও হয়েছে। জানা গেছে, বৈঠকে রওশন প্রথমে বলেছেন, আমার মনে হয় এবার আমাদের শুধু বিরোধী দলে থাকাই ভালো হবে, বিরোধী দলে গেলে কারও মন্ত্রিসভায় থাকা উচিত হবে না। তখন বর্তমান মন্ত্রিসভায় থাকা একজন সদস্য বলেন, ‘বিরোধী দলে থাকার পাশাপাশি মন্ত্রিসভায় থাকতে তো কোনো সমস্যা নেই।’ তখন ওই নেতাকে রওশন বলেন, ‘আপনারা তো পাঁচ বছর মন্ত্রী ছিলেন, দলের কী উপকার হয়েছে, আমাকে বলেন!’ এসময় ঢাকা থেকে নির্বাচিত দলের একজন এমপিও রওশনের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বলেন, ‘কয়েকজন বার বার মন্ত্রী হবে, এটা এবার দরকার নেই। হয় সবাই সরকারে থাকবো, নইলে সবাই বিরোধী দলে থাকবো।’