দেশে শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থানের স্বার্থে ব্যাংক ঋণের সুদ হার সিঙ্গেল ডিজিট বা এক অংকে নামিয়ে আনার ঘোষণা দিয়েও তা কার্যকর করেনি অধিকাংশ ব্যাংক। বরং নানা অজুহাত দেখাচ্ছে তারা। আবার কোনো কোনো ব্যাংকের সুদের হার কমানোর বিষয়টি শুভঙ্করের ফাঁকির মতো। তারা বড় কর্পোরেট ঋণ কিংবা কৃষি ঋণের হ্রাসকৃত সুদ হার দেখিয়ে সিঙ্গেল ডিজিট বাস্তবায়নের কথা বলছেন। কার্যত: অধিকাংশ খাতে ঋণের সুদ হার এখনো দুই অঙ্কে রেখেছেন।
ব্যাংক মালিকদের সংগঠন বিএবি’র কাছ থেকে সব ঋণের ক্ষেত্রেই সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে করতে হবে এমন ঘোষণাই এসেছিল । গত ১ জুলাই ১৮ থেকে যা কার্যকর করা কথা। এ নিয়ে একাধিক বৈঠকও হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক বলেছে, বাস্তবায়ন না করলে ব্যবস্থা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলেছে, যারা সুদ কমাবে না তাদের কর্পোরেট ট্যাক্স কমানো হবে না। নতুন বছর এলেও ব্যাংকগুলো কারো কথার তোয়াক্কা করেনি বরং শিল্পে বিনিয়োগে উত্সাহ না দেখালেও ২০১৮ সালে সবার পরিচালন মুনাফা বেড়েছে। বেশি সুদ, মুদ্রাবাজার ও শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের মাধ্যমে মুনাফার পথে হাঁটলেও শিল্পে পুঁজি জুগিয়ে কর্মসংস্থানমুখী প্রবৃদ্ধি অর্জনের দিকে নজর ছিল কম।
ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তথ্য বিশ্লেষণ করেই দেখা যায়, শিল্প ঋণে মূলধনী ও মেয়াদি উভয় ঋণের ক্ষেত্রে অধিকাংশ ব্যাংকই সিঙ্গেল ডিজিটে সুদের হার নামিয়ে আনার নিয়ম মানছে না। এসব ব্যাংক মাঝারি ও বড় শিল্পের জন্য কিছুটা কম সুদ নিলেও ছোট শিল্পের জন্য অনেক বেশি সুদ নিচ্ছে। ফলে ছোট শিল্পগুলোর জন্য ব্যবসা পরিচালনা করা কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। আর নতুন বেশি সুদ পরিশোধ করেন নতুন শিল্প প্রতিষ্ঠা করাও সম্ভব হচ্ছে না।
সাধারণত, ব্যাংকগুলো বাংলাদেশ ব্যাংকে যে তথ্য দিয়ে থাকে বাস্তবে গ্রাহককে তার চেয়ে বেশি সুদ পরিশোধ করতে হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যানেই দেখা গেছে বেসরকারি খাতের ২৮টি ব্যাংক নির্ধারিত সুদহার না মেনেই ঋণ বিতরণ করছে। অথচ সুদ হার কমাবে এমন ঘোষণা দিয়ে তারা সরকারের কাছ থেকে ৫টি বিশেষ সুবিধাও নিয়েছে।
নভেম্বর পর্যন্ত পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আইসিবি ইসলামী ব্যাংক শিল্প ঋণে সুদ নিচ্ছে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত। ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক শিল্প ঋণে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত সুদ আদায় করছে। এবি ব্যাংক মেয়াদি ও মূলধনী শিল্পঋণে সাড়ে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। ব্র্যাক ব্যাংক মেয়াদি ঋণে ১৮ শতাংশ পর্যন্ত এবং মূলধনী ঋণে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। ডাচ-বাংলা ব্যাংক শিল্প ঋণে সুদ নিচ্ছে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। এছাড়া প্রিমিয়ার ও সাউথ বাংলা এগ্রিকালচার এন্ড কমার্স ১৪ শতাংশ, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটিডে (ইবিএল), দি সিটি সাড়ে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত শিল্প ঋণে সুদ নিচ্ছে। এসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের ব্যাংক এক্সিম ১৬ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে। যদিও তিনিই প্রথম সিঙ্গেল ডিজিটে সুদ হার কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। কিন্তু নিজের ব্যাংকেই তা বাস্তবায়ন করেননি। একইভাবে ফারমার্স ব্যাংক ( যা পদ্মা ব্যাংক নামে নামকরণের পথে), মিডল্যান্ড ও মিউচ্যুয়াল ট্রাস্ট সাড়ে ১৫ শতাংশ, মেঘনা, মধুমতি, ন্যাশনাল, এনআরবি, এনআরবি কমার্শিয়াল ও ওয়ান ১৫ শতাংশ, প্রাইম ব্যাংক সাড়ে ১৬ শতাংশ পর্যন্ত শিল্পঋণে সুদ নিচ্ছে।
ব্যাংক এশিয়া, আইএফআইসি, যমুনা, এনসিসি, এসআইবিএল এবং সাউথইস্ট ব্যাংক ৯ থেকে ১২ শতাংশ সুদে মূলধনী ও মেয়াদি শিল্প ঋণ বিতরণ করেছে। উত্তরা ও পূবালী ব্যাংক মূলধনী শিল্পঋণে ৯ শতাংশ সুদ নিলেও মেয়াদী ঋণে উত্তরা ১২ শতাংশ এবং পূবালী ১৩ শতাংশ পর্যন্ত সুদ নিচ্ছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে দেখা গেছে। রাষ্ট্রীয় মালিকানার ব্যাংকের মধ্যে বেসিক ব্যাংক ক্ষুদ্র শিল্পের মূলধনী ঋণের সুদ নিচ্ছে সাড়ে ১২ শতাংশ থেকে ১২ দশমিক ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত। সিটি ব্যাংক এন এ ছাড়া বিদেশি মালিকানার সবগুলো ব্যাংকের শিল্পঋণে সুদের হার নির্ধারিত মাত্রা ছাড়িয়ে গেছে।
বাংলাদেশে সুদের হার বেশি হওয়ায় বরাবরই এর সমালোচনায় ছিলেন উদ্যোক্তারা। বেশি সুদ হওয়ায় ব্যবসা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়ে যায় যা প্রতিযোগিতামূলক বিশ্ববাজারে টিকে থাকার ক্ষেত্রেও চ্যালেঞ্জ ছিল। অন্যদিকে, সরকার ক্ষুদ্র ও মাঝারি বিনিয়োগকে উত্সাহ দিতে বদ্ধপরিকর। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) প্রতিষ্ঠান উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে ব্যবসায় টেকসই হতে পারে না। সাম্প্রতিক সময়ে দেখা গেছে এসএমই খাতে সুদের হার বরং বেশি। অথচ এখাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। শ্রমঘন অর্থনীতির জন্য এসএমইকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। একইভাবে অন্যান্য খাতেও উচ্চ সুদ হার মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যেখানে দেশে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুত্ সরবরাহও নেই। জ্বালানি সংকট, বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা প্রভৃতি মোকাবেলা করে বাংলাদেশি উদ্যোক্তাদের টিকে থাকতে হয়।