সাভারের ভাকুর্তা অলঙ্কারের হাট

বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত গ্রামীণ জনপদ ভাকুর্তা। সাভার উপজেলার ইউনিয়ন এটি। ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের আমিনবাজার পেরোলেই তুরাগ নদের ওপর ছোট্ট একটি লোহার সেতু। সেখান থেকে ভাকুর্তা মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। এই ইউনিয়নভুক্ত গ্রামের সংখ্যা ৩৬। এই জনপদে গড়ে উঠেছে গহনা শিল্প। গ্রামগুলোর মধ্যে চুনারচর, ডোমরাকান্দা, সোলারমার্কেট, খাগুড়িয়া, নলাগুড়িয়া, মোগরাকান্দা, চাইরা, কান্দিভাকুর্তা, হিন্দুভাকুর্তা, বাহেরচর, মুশরিখোলা, ঝাউচর, লুটেরচর, চরতুলাতলির সর্বত্র অলঙ্কার তৈরি করা হয়। গ্রামের মানুষ কৃষি কাজ ছাড়াও অলঙ্কার তৈরির কাজকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। গেরস্ত বাড়ির পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও অলঙ্কার তৈরির কাজে নিয়োজিত।

রাজধানীর জুয়েলারি দোকানগুলোতে ভাকুর্তায় তৈরি অলঙ্কারের চাহিদা বেশ ভালোই রয়েছে। দোকানিরা বলেন, দফায় দফায় স্বর্ণের দাম বাড়ায় ব্যবসায় মন্দা চলছে। তার ওপর ৫% ভ্যাট দিতে হয়। যার ফলে স্বর্ণে লাভ খুবই কম। সাধ থাকলেও সাধ্যের মধ্যে না থাকায় সোনার গহনা এখন আর অনেকেই কিনেন না। তাই সিটি গোল্ড মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষের একমাত্র ভরসা। এগুলোর দামও যেমন কম আবার সৌন্দর্যও সোনার মতো। গ্রামগুলোতে ছোট-বড়, নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবাই ব্যস্ত থাকেন অলঙ্কার তৈরিতে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অলঙ্কার তৈরি করেন তারা। এতে তাদের ঘরে ফিরে এসেছে সচ্ছলতা।

ভাকুর্তা গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ বাড়ির বারান্দায় গহনা তৈরির সরঞ্জাম। গ্রামের নামেই গড়ে উঠেছে বাজার। সেখানে রয়েছে বিরাট একটি বটগাছ। সেই বটগাছ ঘেঁষে সারি সারি গহনার দোকান। সব দোকানে একই রকমের জিনিস। গহনা তৈরিতে যত কাঁচামালের প্রয়োজন সবই সাজিয়ে বসেছেন দোকানিরা। গহনা তৈরির কাঁচামাল বিক্রির দোকানের মালিক ও কারিগর নিখিল চন্দ্র রাজবংশী। এলাকার বেশিরভাগ মানুষ রাজবংশী। তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, তিন প্রজন্ম ধরে তারা এই কাজ করছেন। গ্রামের প্রায় সবার পেশা গহনা তৈরি করা।

ভাকুর্তা বাজারের গহনার কারিগর নিতেশ সরকার জানান, এক সময় আমরা রূপার গহনা তৈরি করতাম। দাম বাড়ায় এর বিক্রি কমে যাচ্ছে। তাই এখন তামা আর পিতল বেশি ব্যবহার করি। শুধু স্থানীয় লোকজনই নয়, এই পেশার সঙ্গে যুক্ত দেশের অন্য জেলার বাসিন্দারাও। তারাও নিরলস কাজ করছেন এখানে। ভাকুর্তা ইউনিয়নের অধিকাংশ পরিবারেরই কমপক্ষে একজন করে হলেও এই শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। ঢাকার নিউমার্কেট, আজিজ সুপার মার্কেট, চাঁদনীচক মার্কেটসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শপিং মলে গহনা যায় ভাকুর্তা থেকে। মার্কেটগুলোতে সিটি গোল্ড বা এন্টিক নামে এসব গহনা বিক্রি হয়। শুধু দেশে নয়, এখানকার গহনার চাহিদা বিদেশেও। দেশের চাহিদা পূরণ করার পাশাপাশি এসব গহনা রফতানি করা হচ্ছে ভারত ও মধপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। এই শিল্পের আরও প্রসার ঘটলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে দেশের অর্থনীতিতে।

এদিকে ভাকুর্তা ঘিরে গহনার ব্যবসা জমজমাট হয়ে উঠলেও পেশার সঙ্গে যুক্ত লোকজন জানালেন কিছু প্রতিবন্ধকতার কথা। অন্য অনেক খাতে ঋণ পাওয়া গেলেও গহনা তৈরির জন্য কোনো ব্যাংক বা এনজিও প্রতিষ্ঠান ঋণ দেয় না। এর ফলে গহনা তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত মানুষজন তাদের ব্যবসার আকার বাড়াতে পারছেন না। তাছাড়া রাজধানী লাগোয়া হলেও ভাকুর্তার যোগাযোগ অবস্থা ভয়াবহ রকম খারাপ। রাস্তার দুরবস্থার জন্য রাজধানী ও অন্য জেলার ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্রথমবার এসে আর আসতে চান না।