লোভের জিহ্বা যখন অধিক লম্বা হইয়া যায়, তখন কতিপয় মানুষ ন্যূনতম নীতি-নৈতিকতারও ধার ধারেন না। সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নে অনিয়মের সংবাদ প্রকাশ হইয়াছিল একটি জাতীয় দৈনিকে। সংবাদটির সূত্র ধরিয়া তথ্য অনুসন্ধানে দেখা গেল, বিগত অর্ধযুগে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি লইয়া শত শত অনিয়মের সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে। দেশের এমন প্রত্যন্ত অঞ্চল খুব কমই আছে, যেইখানে অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থানের প্রকল্প লইয়া লুটপাটের ঘটনা ঘটে নাই। সুনামগঞ্জের ক্ষেত্রে অনুসন্ধানে দেখা গিয়াছে, অতিদরিদ্রদের জন্য নির্ধারিত প্রকল্পের নাম ও কাজের সহিত কোনো রকমের সংশ্লিষ্টতা নাই, এমন ব্যক্তিদের দিয়া কাজ করানো হইয়াছে। এমনকি জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে টাকাও তুলিয়া লইবার অভিযোগ রহিয়াছে। মৃত ব্যক্তি, প্রবাসী, মানসিক ভারসাম্যহীন, এমনকি কোটিপতিদেরও দেখানো হইয়াছে অতিদরিদ্রদের জন্য গৃহীত প্রকল্পের শ্রমিক বা কর্মী হিসাবে। এই সকল অনিয়ম লইয়া অভিযোগের তির রহিয়াছে দোহালিয়া ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের গঠিত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। এমনকি ইহা লইয়া জেলা প্রশাসক বরাবর একাধিক অভিযোগ করিয়াও কোনো ফলাফল পাওয়া যায় নাই। এমনকি কোনো তদন্তও হয় নাই।
তৃণমূল পর্যায়ে উন্নয়নের স্বার্থে সরকার বিভিন্ন উন্নয়ন খাতে বত্সরের পর বত্সর যেই কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়া আসিতেছে, তাহাতে যেই অনিয়মগুলি ঘটিতেছে, তাহা লজ্জারও বটে। কারণ, এই হতদরিদ্রদের জন্য দেওয়া এইটুকু কর্মসংস্থান লক্ষ লক্ষ গরিবের অন্নসংস্থানের ব্যবস্থা করিয়া দেয়। তাহাদের বঞ্চিত করিবার অর্থ হইল, তাহাদের মুখের ভাত কাড়িয়া লওয়া। সুনামগঞ্জের মতো দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই অনিয়ম প্রতিনিয়ত ঘটিয়া চলিতেছে। গত বত্সর ফরিদপুরের সালথায় অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচির কাজে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গিয়াছে। হতদরিদ্র শ্রমিকের পরিবর্তে বেকু মেশিন দিয়া কম খরচে খাল খনন করা হইয়াছে। কোনো কোনো প্রকল্পে নারী শ্রমিক নেওয়ার নিয়ম থাকিলেও তাহাদের নেওয়া হয় নাই। অন্যদিকে প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের ব্যাংকের হিসাব খুলিবার কথা থাকিলেও প্রকল্পগুলি বাস্তবায়নের দায়িত্বে থাকা ইউপি সদস্যরাই তাহাদের পরিচিত লোকজন দিয়া ব্যাংকে হিসাব খুলিয়া থাকেন। এইভাবে পদে পদে অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। অধিকাংশ এলাকায় কাজ না করিয়াও ভুয়া শ্রমিকদের নামে তুলিয়া নেওয়া হইতেছে টাকা। এই সকল অনিয়ম প্রশাসনিক কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের যোগসাজশে হয় বলিয়া অভিযোগ রহিয়াছে। ইহার ফলে সার্বিকভাবে ভেস্তে যাইতেছে সরকারের লওয়া এই সকল মহত্ উদ্যোগ। এই ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট আমরা একটি গত্বাঁধা কথা শুনিয়া থাকি যে, অতিদরিদ্রদের কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নে কোনো অনিয়ম প্রশ্রয় দেওয়া হইবে না। নীতিমালা মানিয়া প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করিতে বলা হয়। অনিয়ম পাইলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও শুনা যায়; কিন্তু বাস্তবে ব্যবস্থা খুব কমই নেওয়া হয় বলিয়া অনিয়ম করিয়া পার পাইয়া যাইতেছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী বিভিন্ন অংশ।
এমনিতেই অতিদরিদ্রদের দেখিবার কেহ নাই। তাহার উপর এই অতিদরিদ্রদের জন্য সরকারের দেওয়া সুযোগ-সুবিধা যদি জোঁকের মতো শুষে নেওয়া হয়, তাহা হইলে তাহারা যাইবে কোথায়?