‘এবারক্যা বানোতে একনা ইলিপ পানো না’

গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে সড়কপথে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সীচা গ্রাম। তারপর সীচা থেকে নৌকাযোগে এক ঘণ্টার পথ পেরিয়ে উপজেলার কাপাসিয়া ইউনিয়নের বাদামেরচর গ্রাম। গ্রামের চারদিকে শুধু পানি আর পানি। বন্যা ছাড়াও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেলে গ্রামটি প্লাবিত হয়।

এই গ্রামের মোমেনা বেগমের (৪৫) বাড়ির উঠোন ও আঙিনায়                ন। কারণ বাড়িতে আছে গরু-বাছুর, হাঁস-মুরগি। তাই গত ১০ দিন ধরে পানির মধ্যেই বাড়িতে বসবাস করছেন। রোববার সকাল ১০টার দিকে মোমেনা বেগম কলস নিয়ে খাবারের জন্য নলকূপের পানি সংগ্রহ করতে যাচ্ছিলেন। এ সময় তার কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, দিনের বেলা কষ্ট করে থাকা যায়। কিন্তু রাতে পোকামাকড়ের ভয়ে চোখে ঘুম আসে না।

তিনি নিজের ভাষায় বলেন, ‘তাই ছোলের বাপ জাগি থাকে, হামরা ঘুমাই। হামরা জাগি থাকি, ছোলের বাপ ঘুমায়। এভাবে হামারঘরে আইত (রাত)  চলি যায়।’

তিনি আরো বলেন, ‘এবারক্যা বানোত (বন্যায়) একনা ইলিপ পানো না।’ মোমেনা বেগমের মতো বাদামেরচর গ্রামের অনেকেই জানালেন তাদের এই রকম দুর্ভোগের কথা।

সরেজমিনে ঐ গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, তিস্তার পানি রোববার থেকে কিছুটা কমতে শুরু করলে মোমেনা বেগমের মতো এখনো গ্রামের সবার ঘরবাড়িতে হাঁটুপানি। অনেকে ঘরে চৌকিতে হাঁস-মুরগি, ছাগল-ভেড়া রেখেছেন। আবার অনেকে ঘরের ভেতরে চৌকির ওপর রান্নাবান্না করছেন। কেউ আঙিনায় পানির মধ্যে সাংসারিক কাজ করছেন। কেউ বাড়ির উঠোনে পানির মধ্যে দাঁড়িয়ে গল্পগুজব করছেন। ছোট ছেলেমেয়েরা ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।

গ্রামের অপর গৃহিণী রাশেদা বেগম (৫০) বলেন, ‘বাড়ি থেকে বাঁধ অনেক দূরে। তাই গত ১০ দিন ধরে বাড়িতেই আছি। এই ১০ দিনে আমাদের গ্রামে কোনো সরকারি লোকজন আসেনি। আমরা এক ছটাক চালও ত্রাণ পাইনি। ঘরে চাল ছিল, তা দিয়ে চলছি। চেয়ারম্যান-মেম্বররা খোঁজ নেননি।’

একই গ্রামের দিনমজুর মোশারফ হোসেন (৫৫) বলেন, ‘বানের মধ্যে কোথায় যাব? যাবার জায়গা নেই। তাই বাড়িতে কষ্ট করে আছি। বাড়ির প্রসাব-পায়খানার ঘর ডুবে গেছে। মলমূত্র পানিতে ভাসছে।’

তিনি বলেন, ‘একবেলা না খেয়ে থাকা যায়, কিন্তু প্রস্রাব-পায়খানা না করলে থাকা যায় না। সেই প্রস্রাব-পায়খানা নিয়ে আমরা সমস্যায় আছি। কলার ভেলায় করে দূরে গিয়ে প্রস্রাব-পায়খানার কাজ সেরে নিচ্ছি।’

ঐ গ্রামের কৃষক আমিনুল হক (৫০) বলেন, ‘দুর্গম এলাকা বলে এই গ্রামে কেউ ত্রাণ দিতে আসতে চায় না। সবাই উঁচু জায়গায় এসে ত্রাণ দিয়ে চলে যায়। আমরাও বাড়ি ছেড়ে বন্যার মধ্যে কোথাও যেতে পারি না। তাই আমরা সমস্যায় পড়েছি। মানবেতর জীবন যাপন করছি।’

একই গ্রামের বাসিন্দা রশিদা বেগম (৫২) বলেন, ‘আমরা পানির মধ্যে বসবাস করছি। দিনে সাবধানে থাকা যায়, কিন্তু রাতে সাপের উপদ্রব বেড়ে যায়। কারণ চরাঞ্চলে অবস্থিত আমাদের এই গ্রামে বিদ্যুত্ নেই। ফলে রাতে আমরা আতঙ্কে থাকি। ঠিকমতো ঘুমাতে পারি না।’

বাদামেরচর গ্রামের ইউপি সদস্য হামিদুল হক বলেন, ‘গ্রামটিতে প্রায় ২ হাজার মানুষের বসবাস। চাল পেয়েছি মাত্র দেড় মেট্রিক টন, যা ১৫৫ জনের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে।’ তিনি বলেন, চেয়ারম্যানের মাধ্যমে সুন্দরগঞ্জ ইউএনওর কাছে আরো ত্রাণ চাওয়া হয়েছে।   

কাপাসিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জালাল উদ্দিন সরকার বলেন, ‘আমার ইউনিয়নে বেশির ভাগ গ্রাম তিস্তা নদীর চরাঞ্চলে অবস্থিত। লোকসংখ্যা প্রায় ২৬ হাজার। এর মধ্যে বেশির ভাগ লোকই অভাবী। কিন্তু সেই অনুপাতে ত্রাণ পাইনি।’

তিনি আরো বলেন, ‘রোববার পর্যন্ত ইউনিয়নে মাত্র ১৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ পেয়েছি, যা প্রতিজনে ১০ কেজি হিসেবে ১ হাজার ৪০০ লোকের মধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। এ ছাড়া আজ ৩০০ প্যাকেট শুকনো খাবার পেয়েছি। বাদামেরচরসহ গোটা ইউনিয়নে এসব প্যাকেট বিতরণ করা হবে।’ 

দুর্গম এলাকায় ত্রাণ পৌঁছানোর বিষয়ে রোববার বিকেলে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মতিন বলেন, জেলা প্রশাসন ত্রাণ দেয় উপজেলা প্রশাসনকে। উপজেলা প্রশাসন ত্রাণ দেয় ইউপি চেয়ারম্যানদের। ইউপি চেয়ারম্যানরা আবার ইউপি সদস্যদের মাধ্যমে গ্রামে ত্রাণ বিতরণ করেন। এভাবে দুর্গম এলাকাগুলোতে ত্রাণ পৌঁছে যাচ্ছে। 

গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্রের পানি ১৭ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৩৫ সেন্টিমিটার এবং ঘাঘটের পানি ১৯ সেন্টিমিটার কমে বিপত্সীমার ৩ সেন্টিমিটার ওপরে রয়েছে। তিস্তার পানি ১০ সেন্টিমিটার কমেছে। করতোয়ার পানি ২৬ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে তিস্তা ও করতোয়া বিপত্সীমার অনেক নিচে রয়েছে।