কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকে সৃষ্ট জালিয়াতির ঘটনায় সংশ্লিষ্ট দায়ী কোম্পানির বিরুদ্ধে চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ। তা জানিয়ে সফটওয়্যার সরবরাহকারী মূল প্রতিষ্ঠান টেমিনসকে চিঠি দিয়েছে ব্যাংকটি। সৃষ্ট জালিয়াতি ও সাইবার নিরাপত্তা ঝুঁকির বিষয়টি আমলে নিয়ে ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে এ চিঠি দেওয়া হয়। বৈঠকে পর্যবেক্ষক তথা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধিও উপস্থিত ছিলেন। পরিচালনা পর্ষদ সদস্যদের কারো কারো দ্বিমত সত্ত্বেও দায়ী প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে জানিয়েছে ব্যাংকিং সূত্র।
সূত্রমতে, গত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে টেমিনসের স্থানীয় প্রতিনিধি ফ্লোরা টেলিকমের সঙ্গে টেমিনসের সঙ্গে চুক্তি বাতিল হওয়ায় এতদসংক্রান্ত অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গেও ফ্লোরা টেলিকমের সম্পাদিত সব চুক্তি বাতিলের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। মেইনটেন্যান্স কোড এবং লাইসেন্সের মেয়াদ আরো এক মাস বৃদ্ধি এবং ঐ সময়ে মেইনটেন্যান্স সার্ভিস তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিত্বকারী অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে অব্যাহত রাখতে টেমিনসকে চিঠি দিতে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে টেমিনসের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সেবা সুবিধা অব্যাহত রাখতেও টেমিনসকে অনুরোধ জানান হয়।
প্রসঙ্গত, ফ্লোরা টেলিকম টেমিনসের স্থানীয় প্রতিনিধি। কিন্তু কোম্পানিটির বিরুদ্ধে অগ্রণী ব্যাংকের এক জন কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে নোটিফিকেশন অ্যাওয়ার্ড তৈরি করায় অগ্রণী ব্যাংক শো’কজ নোটিশ জারি করে এবং বিষয়টি টেমিনসকে জানানো হয়। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ তদন্তের জন্য কমিটি গঠন করে দেয় অগ্রণী ব্যাংক। ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত হয়ে টেমিনস গত ২৬ জুন ২০২০ তারিখে তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি ফ্লোরা টেলিকমের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ বাতিল করে দেয় এবং তা অগ্রণী ব্যাংককে জানিয়ে দেওয়া হয়। গত ৩০ জুন অগ্রণী ব্যাংকের সঙ্গে টেমিনসের চুক্তির মেয়াদও শেষ হয়ে যায়। কিন্তু কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যার আপগ্রেডেশনের কাজটি বাধাগ্রস্ত হয়।
ব্যাংকটির একটি সূত্র জানায়, অত্যাবশ্যকীয় সফটওয়ার ভার্সন আপগ্রেড করার কথা থাকলেও তা না করায় অর্থনৈতিক ঝুঁকিসহ বিবিধ সেবা ঝুঁকিতে পড়ে অগ্রণী ব্যাংক। সফটওয়ার ভার্সন আপগ্রেড করা লাগবে এমন তথ্য পরিচালনা পর্ষদকেও জানানো হয়নি। ফলে, গত ৩০ জুন অনুষ্ঠিত পরিচালনা পর্ষদের বৈঠকে কোনো কোনো পরিচালক হতাশা ব্যক্ত করেছেন। আবার কেউ কেউ দায়ী কোম্পানির পক্ষাবলম্বনও করেছেন। নিয়ম অনুযায়ী বিষয়টি ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষেরই দায়িত্ব ছিল পরিচালনা পর্ষদকে অবহিত করা। কিন্তু তা করা হয়নি। ফলে, পরিস্থিতি জটিল হয়ে যায়। সূত্রমতে, প্রদত্ত সহায়তা বা সেবা এক বছরের মধ্যে স্থগিত বা বন্ধ হয়ে যাবে এমন বিষয়টি ২০০৮ সালে সংস্করণটির পুনঃলাইসেন্সকরণের সময়ও পরিচালনা পর্ষদের গোচরীভূত করা হয়নি। কোনো কোনো ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার যোগসাজশে কারিগরি ঝুঁকিতে ফেলে দিয়ে ব্যাংকের প্রায় শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অপকৌশলই ছিল এই লুকোচুরির মূল উদ্দেশ্য। সংশ্লিষ্ট কেউ কেউ ঐসব ঊর্ধ্বতনদের বিষয়টি জানালেও তাদের থামিয়ে দেওয়া হয়েছিল বলে জানিয়েছে কোনো কোনো সূত্র। তাদের মতে, দোষী কোম্পানি ভবিষ্যতে যাতে স্পর্শকাতর ব্যাংকিং খাতের সঙ্গে ব্যবসা করতে না পারে সে ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এ ব্যাপারে ব্যাংকের আইনগত পরামর্শকরাও দোষী কোম্পানিটির বিরুদ্ধে সব ব্যাবসায়িক কার্যক্রম বন্ধের সুপারিশ করেছে।