ফল

আষাঢ়ের ফল

 

গ্রামবাংলার অতি জনপ্রিয় ফল। ঋতুর রঙ্গমঞ্চে আষাঢ় মাস যখন আসন পেতে বসে, তখন কচি তালের শাঁস যুক্ত সুপেয় পানি অন্যরকম লাগে। এই কাঁচা, পাকা উভয় ফল-ই বাঙালির প্রিয়।

একলিঙ্গ বিশিষ্ট শাখা-প্রশাখা বিহীন তাল বৃক্ষ। উচ্চতায় ৬০ থেকে ৭০ ফুট। গুঁড়ি গোলাকার, পাতা শক্ত—দেখতে পাখার মতো, অনেক উঁচু শিরা আছে। গাছের শিরাগুলো পত্রদণ্ডের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত বিস্তৃত। আর পত্রদণ্ডের উভয় কিনারে কালো রঙের করাতের মতো দাঁত থাকে। পুরুষ তালগাছে ফল ধরে না। স্ত্রীগাছে গরমের আগে মোচার মতো ফুল আসে। একটি মোচায় ২০-২৫টি ফল ধরে। ফলগুলো দেখতে গোলাকার। ফলের রং কালো বা গাঢ় হলুদ। প্রতি ফলে তিন-চারটি বীজ থাকে। তালগাছের আয়ু ১০০ বছর।

তালগাছের কারু থেকেও রস সংগ্রহ করা হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি; মিছরিও তৈরি হয়ে থাকে। ভাদ্র মাস এলেই পাকা তালের ম-ম গন্ধ, চমত্কার এক অনুভূতি প্রকৃতিতে জানান দেয়। তাল যখন চুলায় গরম করা হয়, তখন সে গন্ধে মন এমনিতেই ভরে যায়। আর ভাদ্রের শেষে আশ্বিনে তালের গন্ধ থাকে গ্রামের ঘরে ঘরে। তালের পিঠা, তালের বড়া, তালের খির ঐতিহ্যবাহী খাবার।

গাঁও-গ্রামে কথিত আছে—তাল একটা নয়, দুটো নয়, তিনটি অথবা সাতটি খেতে হবে। না খেলে অমঙ্গল হয়। তাল-তেঁতুল, কুলবংশ করে নির্মূল। তালগাছ রোপণ করলে আয়ু কমে যায়—এ ভয়ে অনেকে তালগাছ লাগান না। এসবই কুসংস্কার। কুটুম আপ্যায়নে তালের জুড়ি নেই। তরতাজা তালের রস মূত্রবর্ধক, প্রদাহনিবারক ও সর্দি-কাশির মহৌষধ বলে গণ্য। এই গাছ গরিব-দুখীর বন্ধু ও বিপদ-আপদে সহায়ক। এ গাছের উপকরণ তালপাতার পাখা, ডোঙ্গা, খেলনা ও ঘরের ছাউনি তৈরিতে ব্যবহার হয়। পত্রদণ্ডের আঁশ কুলা বাঁধতে সহায়ক। তালের গুঁড়ি বা কাঠ দিয়ে ঘর তৈরি করা যায়।

বাংলাদেশের প্রায় সর্বত্রই বিক্ষিপ্তভাবে জন্মায়। ঘূর্ণিঝড় ও বজ্রঝড় ঠেকাতে দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে লাগানো উচিত। সোনারগাঁয়ে প্রচুর তালগাছ ছিল। এখন বাড়ি-ঘর নির্মাণে কমে যাচ্ছে। তালগাছের কথা এলেই শৈশবে পড়া রবীন্দ্রনাথের কবিতাটি মনে পড়ে—তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে/সব গাছ ছাড়িয়ে/উঁকি মারে আকাশে...।