খন্দকার নাঈমা আক্তার নুন
একটি বেসরকারি সংস্থা Environment and Social Development Organisation (ESDO) বলেছে, ২৬ মার্চ থেকে ২৫ এপ্রিল পর্যন্ত এই সময়ের মধ্যে ১৪ হাজার ৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। পিপিই, সার্জিক্যাল মাস্ক, সার্জিক্যাল হ্যান্ড গ্লাভস, পলিথিনের হ্যান্ড গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজারের বোতল, পলিথিন ব্যাগ ইত্যাদি যেন মানুষের নিত্যসঙ্গী।
৮ মার্চের পরে এসব মেডিক্যাল সরঞ্জামাদির চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলছে। মেডিক্যাল বর্জ্যগুলো অটোক্লেভ মেশিনের মাধ্যমে জীবাণুমুক্ত করে উচ্চ তাপমাত্রায় পুড়িয়ে ফেলার বিধান থাকলেও হাতে গোনা কয়েকটি হাসপাতাল তা মেনে চলছে।
তাছাড়া, বেশির ভাগ মানুষই এসব মাস্ক, গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার জীবাণুমুক্ত না করে যত্রতত্র ফেলে দিচ্ছে। এই মেডিক্যাল বর্জ্যগুলো একদিকে যেমন সংক্রমণের ব্যাধি ছড়ানোর মাত্রাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে আবার পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণ হয়েও দাঁড়াচ্ছে।
বর্ষা মৌসুমে এ বর্জ্যগুলো বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে বিভিন্ন খাল, ডোবা, নদনদীর পানিতে যাবে। ফলে পানি দূষিত হবে। আবার মেডিক্যাল বর্জ্যগুলোর জীবাণু বাতাসে মিশে বায়ু দূষিত করবে।
মেডিক্যাল বর্জ্যসহ আমরা যে প্রতিনিয়ত চা, কফি, জুস, মুদির দোকানের পলিথিন ব্যবহার করছি তা ৫০ বছর পর্যন্ত টিকে থাকে। ফলে দূষিত হচ্ছে মাটি।
পরিবেশের তিনটি উপাদান মাটি, পানি, বায়ু দূষিত হচ্ছে। যার প্রভাব পড়ছে আমাদের জীববৈচিত্র্যের ওপর, জলবায়ুর ওপর। জলবায়ু পরিবর্তনে বিভিন্ন প্রাণীর জটিল রোগ দেখা যাচ্ছে যেমন—শ্বাসকষ্ট, হার্ট অ্যাটাক, ক্রনিক ব্রঙ্কাইটিস, ক্যানসার ইত্যাদি।
বেড়ে যাচ্ছে অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেমন—সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ইত্যাদি।
মেডিক্যাল বর্জ্যসহ প্রতিনিয়ত আমাদের ব্যবহূত এসব বর্জ্য ভূমি ক্ষয় করে। ভূমির উর্বরতাকে হ্রাস করে। ভূমির উর্বরতা কম হলে গাছ জন্মাতে পারবে না। গাছপালাকে কেন্দ্র করে হাজারো প্রজাতি ও প্রাণীর বাসস্থান। আবার জমির উর্বরতা কমে গেলে ভবিষ্যতে দেখা দিতে পারে খাদ্যসংকট। যা আমাদের অর্থনীতে চরম প্রভাব ফেলবে। উর্বরতা বৃদ্ধি করতে বা ফলন ভালোর আশায় অনেক কৃষক জমিতে কীটনাশক ব্যবহার করে।
বৃষ্টির পানির সঙ্গে এই কীটনাশক ও বর্জ্যগুলো মিশে পানিতে থাকা জলজ উদ্ভিদগুলোর ক্ষতি করে। অনেক সময় বিষের মাত্রা বেশি হলে পানিতে থাকা মাছগুলো মরে যায়। মাছের সঙ্গে সঙ্গে পানিতে থাকা ম্যাকরোফাইট, ফাইটোপ্লাংকটন, জুপ্ল্যাংকটন এগুলো উদ্ভিদের জন্য চরম ক্ষতি হয়। অতিরিক্ত দূষিত পানিতে অক্সিজেনের মাত্রা কমে যায়। তাই জলজ প্রাণীগুলো এই দূষিত পানিতে বেঁচে থাকতে পারে না। মাটি, পানি, বায়ুদূষণের ফলে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে আর চরম সংকটের মুখে আমাদের জীববৈচিত্র্য।
এই বিপজ্জনক বর্জ্য থেকে নিজেদের ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হলে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয় তথা সুস্থতার সঙ্গে জীবন ধারণের জন্যই প্রয়োজন সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্যের। মানুষসহ সমগ্র প্রাণী ও উদ্ভিদজগতের বেঁচে থাকার জন্য প্রাকৃতিক ভারসাম্য একান্ত অপরিহার্য। আর এই ভারসাম্য বজায় রাখতে সঠিক সংখ্যায় সব প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতির বেঁচে থাকাটা অত্যন্ত জরুরি। মানুষের সুস্থভাবে বেঁচে থাকা এবং স্বাভাবিক জীবনযাপনের স্বার্থে জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা আবশ্যক। বর্তমান ও ভবিষ্যত্ প্রজন্ম বেঁচে থাকার জন্য জীববৈচিত্র্য প্রয়োজন। তাই জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে হবে। এজন্য হাসপাতালগুলোতে মেডিক্যাল বর্জ্যসমূহ নির্দেশনা মেনে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আর আমরা যারা সাধারণ মানুষ মাস্ক, হ্যান্ড গ্লাভস ব্যবহার করি, তারা এগুলো যত্রতত্র না ফেলে নির্দিষ্ট স্থানে উচ্চ তাপমাত্রায় পুুুুড়িয়ে ফেলব। এভাবে আমরা বিপজ্জনক বর্জ্য থেকে নিজেদের ও জীববৈচিত্র্যকে রক্ষা করতে পারব।
n লেখক : শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়