৬ জুলাই প্রয়াত হলেন এন্ড্রু কিশোর (১৯৫৫-২০২০)। কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি বিশ্বের সম্পদ। কারণ একজন শিল্পী দেশকালের সীমারেখা তার প্রতিভাগুণে অতিক্রম করতে পারেন। তিনি জনপ্রিয় ছিলেন, কেবল জনপ্রিয় নন, তিনি লোকপ্রিয় ছিলেন। পারিবারিক জীবনে ছিলেন বস্তুনিষ্ঠ কিন্তু উদারনৈতিক ব্যক্তিত্ব। ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে তিনি মেনে নিয়েছিলেন অবধারিত মৃত্যুকে। এজন্য তার মহাপ্রয়াণটি যেন দেশের মাটিতে হয়, সে আবেদন করেছিলেন সিঙ্গাপুরের ডাক্তার ও সেখানকার বাংলাদেশের হাইকমিশনকে। তিনি কি এদেশকে খুব বেশি ভালোবেসেছিলেন। ‘ভালোবেসে গেলাম শুধু ভালোবাসা পেলাম না’—তার কণ্ঠের এ গানটি খুব বেশি বাস্তব কি? বলতে হয় ভালোবাসা তিনি পেয়েছেন, পাচ্ছেন এবং ভবিষ্যতেও পাবেন। তার সংগীতের মায়া লেগে থাকবে এদেশের আরো কয়েক প্রজন্মের সন্তানদের ভেতর। কিছু গান চিরকালের আবেদনে বারবার উচ্চারিত হবে মানুষের কণ্ঠে। এজন্যই এক শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘এন্ড্রু কিশোর তার গানের মাধ্যমে মানুষের হূদয়ে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।’ আমরা সবাই জানি, তার চিকিত্সার ব্যয়ভার বহন করেছেন সরকারপ্রধান, মানবতার দিশারি শেখ হাসিনা। পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা সকলে তার প্রতি কৃতজ্ঞ।
এন্ড্রু কিশোরের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় তার মগবাজারের বাসায়। ১৯৮৯ সালে আমি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র। তার সহধর্মিণী লিপিকা খান, যাকে আমরা ছোটবেলা থেকে ইতিদি ডাকছি, তিনি আমার ফুপাতো বোন। আমার বাবারা ছিলেন চার বোন, দুই ভাই। সেই চার বোনের সেজোজনের মেয়ে ইঞ্জিনিয়ার লিপিকা খান। ইতিদিরাও চার বোন দুই ভাই। দিদির সূত্রে নিকটাত্মীয় হলেও তখন কিশোরদা দেশের খ্যাতিমান কণ্ঠশিল্পী। এজন্য সম্মান, সমীহ ও সতর্কতার সঙ্গে তার সঙ্গে কথা বলা শুরু করি। যেহেতু দিদি আমাকে ‘তুই’ সম্বোধন করেন, এজন্য প্রথম থেকে তিনিও আমাকে সেভাবেই ডেকে এসেছেন।
তার সৌজন্যেই দেশের সাংস্কৃতিক জগতের বিখ্যাত কিছু ব্যক্তির সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছিল। এন্ড্রু কিশোর বাংলা চলচ্চিত্রের সর্বাধিক গান গাওয়া শিল্পী। চলচ্চিত্রে তার চেয়ে বেশি জনপ্রিয় গান আর কারো নেই। ১৯৭৭ সালে আলম খানের সুরে ‘মেইল ট্রেন’ চলচ্চিত্রে ‘অচিনপুরের রাজকুমারী নেই যে তার কেউ’ গানের মধ্য দিয়ে তার চলচ্চিত্রে প্লেব্যাক যাত্রা শুরু হয়। তারপর ‘ডাক দিয়াছেন দয়াল আমারে’ গানের মধ্য দিয়ে জনগণের হূদয়ে পৌঁছে যান। তাকে ‘প্লে-ব্যাক’ সম্রাট বলা হয়।
১৯৫৫ সালের ৪ নভেম্বর এন্ড্রু কিশোরের জন্ম রাজশাহীতে। স্বাধীনতার পর প্রথমে বাবা ও পরে তার মা মারা যান। বড় বোন ডাক্তার শিখা বিশ্বাসের আদর স্নেহ ভালোবাসায় বড় হন এই শিল্পী। রাজশাহীতে বোনের বাসাটি ছিল কিশোরদার প্রিয় প্রাঙ্গণ। রাজশাহীর সঙ্গে তার ছিল প্রাণের যোগাযোগ। তিনি স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরো শিক্ষাজীবনটাই রাজশাহীতে শেষ করেন। তার সংগীতজীবনের সূচনাও সেখান থেকে। ওস্তাদ আব্দুল আজিজ বাচ্চুর কাছ থেকে তালিম নিয়ে তিনি সমৃদ্ধ হন। এজন্য ওস্তাদের স্মৃতি রক্ষার্থে একটি স্মৃতি সংসদ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি ছিল তার আলাদা টান। বিশেষত বিভিন্ন সময়ে সমাবর্তনের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে তিনি একাধিকবার অংশগ্রহণ করে দর্শক মাতিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পেশাদার কণ্ঠশিল্পী। নব্বইয়ের দশকে বসে তার সঙ্গে যখন কথা বলছি, তার আগে থেকে অর্থাত্ আশির দশক থেকে তার গানের জনপ্রিয়তা তুঙ্গে। তখন থেকে তিনি দুই বাংলায় গান করেছেন। একের পর এক জনপ্রিয় গান উপহার দিচ্ছেন। ১৯৮২ সাল থেকে ক্রমান্বয়ে বাংলা চলচ্চিত্রের গানে অবদান রাখার জন্য তিনি আট বার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পেয়েছেন।
কণ্ঠশিল্পী হিসেবে খ্যাতিমান হয়েছিলেন ঠিকই; তাই বলে তিনি কখনো কোটিপতি ছিলেন না। যত দূর মনে পড়ে, এক দিন বলেছিলেন তার সিনিয়র সাবিনা ইয়াসমীন, রুনা লায়লা একটি গানের জন্য তিন-চার হাজার টাকা পান। সেখানে তার ইনকাম রাশি রাশি মনে করার কোনো কারণ নেই। এজন্যই ১৯৮৭ সালে জলি ডহুর ও অন্যদের সঙ্গে মিলে ‘প্রবাহ’ নামে বিজ্ঞাপন প্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন। আর্থিক সংগতি বৃদ্ধির জন্যই আমার বোনকে বুয়েট থেকে আরেকটি ডিগ্রি নিয়ে প্রকৌশলী হিসেবে চাকরিতে যোগ দিতে হয়েছিল।
এন্ড্রু কিশোর ছিলেন ধর্মীয় বিশ্বাসে খ্রিষ্টান কিন্তু আপাদমস্তক অসাম্প্রদায়িক ব্যক্তিত্ব। শিল্পী-সাহিত্যিকদের জীবনে যে প্রগতিশীল চেতনা থাকা দরকার তা তার মধ্যে বিকশিত হয়েছিল। এজন্য একমাত্র কন্যা সংজ্ঞা যখন একজন মুসলিম ছেলের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে চেয়েছে তখন তিনি সম্মতি দিয়েছেন। এমনকি আমাদের সম্প্রদায়ের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে কেউ কেউ মনঃক্ষুণ্ন হলেও পরে কিশোরদার উদারতাকে স্যালুট জানিয়েছেন।
আসলে এন্ড্রু কিশোর ছিলেন বিশাল হূদয়ের মানুষ, মানবিক চেতনায় অনন্য। আর দেশপ্রেমের দৃষ্টান্তে অতুলনীয়। তিনি রেখে গেছেন আমাদের জন্য অসীম শূন্যতা। কিশোরদা, আপনার জীবনের গল্প তো এখনো শেষ হয়নি। ‘হায় রে মানুষ রঙিন ফানুস’ উড়িয়ে দয়ালের ডাকে কোথায় হারালেন? মৃত্যু হয়তো দেহের পিঞ্জর ভেঙে ডানা মেলেছে। তবু বেঁচে থাকার নিভৃত কুহক গান গেয়ে যায়, ‘সবাই তো ভালোবাসা চায়’, সেখানে আপনি ছিলেন ‘চিরকালের প্রেমের কাঙাল’।
n লেখক :অধ্যাপক, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়