শ্রেণিসংগ্রাম :সার্টিফিকেট যখন ডাস্টবিনে

ছোটবেলা থেকে আমরা একটা কথা শুনে এসেছি ‘শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড’। সেই শিক্ষা গ্রহণকারী শিক্ষার্থীরা করোনাকালে এক নিষ্ঠুর অমানবিক আচরণের শিকার হয়েছে। বাড়ি ভাড়া নিয়ে সংকটের এই ইস্যুটি নতুন করে ভাবিয়ে তুলেছে আমাদের। ঢাকার পূর্বরাজাবাজার এলাকাতে সেখানে একটি মেসবাড়ির ১৩০ জন শিক্ষার্থীর দুই মাসের ভাড়া বকেয়া থাকায় বাড়িওয়ালা কোনো নোটিশ ছাড়াই তাদের সব মালপত্র গ্যারেজে ফেলে দেন। প্রায় একই ধরনের ঘটনা ঘটেছে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকায়। শিক্ষার্থীদের মালামাল থেকে শুরু করে সার্টিফিকেট, বইপত্র, ল্যাপটপ, কম্পিউটার ফেলে দিয়েছেন দুই বাড়িওয়ালা। এই অমানবিকতা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। প্রশ্ন ওঠেছে, বাড়ির মালিক ও ভাড়াটিয়াদের যে দ্বন্দ্ব্ব চলছে তার সমাধান কী?   ‘বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন ১৯৯১’ অনুযায়ী, ‘চুক্তি অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করে থাকলে ভাড়াটিয়াকে হঠাত্ করে উচ্ছেদ করা যায় না। চুক্তিপত্র না থাকলে যদি কোনো ভাড়াটিয়া প্রতি মাসের ভাড়া পরবর্তী মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে পরিশোধ করে, তাহলেও ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করা যাবে না। যুক্তিসংগত কারণে ভাড়াটিয়াকে উচ্ছেদ করতে চাইলে যদি মাসিক ভাড়ায় কেউ থাকে, সে ক্ষেত্রে ১৫ দিন আগে নোটিশ দিতে হবে। ভাড়াটিয়া নিয়মিত ভাড়া পরিশোধ করা অবস্থায় যদি বাড়িওয়ালা তাকে উচ্ছেদ করার চেষ্টা করে, তাহলে আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার ভাড়াটিয়ার রয়েছে’।

ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ-ক্যাবের হিসাব বলছে, গত ২৫ বছরে বাড়ি ভাড়া বেড়েছে ৪০০ গুণ আর দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ২০০ গুণ। অর্থাত্ বাড়ি ভাড়া দ্রব্যমূল্যের তুলনায়ও দ্বিগুণ বেড়েছে (সূত্র: বিবিসি বাংলা, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২০)।

কেন এমন হচ্ছে?

১. বাড়ি ভাড়া আদায় বা বাড়ি খালি করা নিয়ে সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা থাকলেও কেউ সেটা তোয়াক্কা করে না। ঢাকা সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা অনুযায়ীও ভাড়া আদায় করা হচ্ছে না।

২. জীবিকার পথ হিসেবে শিক্ষার্থীদের নির্ভর করতে হয় মূলত টিউশনি অথবা কোচিং সেন্টারে ক্লাস করিয়ে পাওয়া অর্থের ওপর। করোনা মহামারির প্রভাবে গ্রামে ফিরে যাওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের জন্য এসব আয়ের উত্স বন্ধ হয়ে গেছে। অপরদিকে, মহামারির প্রভাবে জীবিকা হারিয়ে নিঃস্ব হচ্ছে অনেকের পরিবার। স্বাস্থ্য খাতে সমস্যার পাশাপাশি এক ধরনের অর্থনৈতিক সংকটে রূপ নিয়েছে, যে সংকটের মূলে দারিদ্র্য।

 ৩. বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার মধ্যে বিশেষ ধরনের সম্পর্ক বিদ্যমান। এটা জমিদার ও প্রজা সম্পর্ক। সমাজতান্ত্রিক দিক দিয়ে কার্ল মার্ক্সের ‘শ্রেণি সংগ্রাম’ (বুর্জোয়াওপ্রলেতারিয়েত) তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করা যেতে পারে। বুর্জোয়ারা এমন একশ্রেণি যারা সকল উত্পাদনের মাধ্যম (means of production) যেমন— প্রাকৃতিক সম্পদ, মিল, কারখানা এবং উত্পাদনের জন্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত অনুষঙ্গ নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে, সম্পত্তিহীন সর্বহারা (Proletariat) শ্রেণিকে শোষণ করতে থাকে। বাড়িওয়ালা এখানে বুর্জোয়ার মূর্তিমান আতঙ্ক হয়ে ভাড়াটিয়া শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তেমনই সামন্ত-প্রভুর আচরণ করছে।

৪. বাড়ির যারা মালিক তাদের রাজনৈতিক প্রভাব ভাড়াটিয়াদের চেয়ে বেশি। ভাড়ার জন্য সার্টিফিকেট ডাস্টবিনে ফেলে দেওয়া এক ধরনের কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার চিত্র মাত্র। ৫. যারা উচ্চশিক্ষা নিচ্ছে তাদের একটি বড় অংশ ‘আবাসনসংকট’ থাকা বাড়ি ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে। করোনার দীর্ঘ ছুটিতে যারা ভাড়া করা বাড়ি না ছেড়ে দিয়েছে তাদের এখন না থেকেও ভাড়া গুনতে হচ্ছে। সমাধান কী?

১. বাড়ি ভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ (৩ নম্বর আইন ) সময়োপযোগী করে কার্যকর করা। বাড়ি ভাড়া নিয়ে যেসব আইন ও বিধিমালা রয়েছে সে বিষয়ে মানুষের আরো সচেতন হওয়া প্রয়োজন।  

২. উভয়ের জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতামূলক আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। রাষ্ট্রকেই শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে হবে। আজকের শিক্ষার্থীরা আগামী দিনের ভবিষ্যত্ ও জাতির কর্ণধার। মহামারির এই সময়ে এমন বর্বরতা কাম্য নয়। অনেক বাড়িওয়ালা ইচ্ছেমতো ভাড়া বাড়াচ্ছেন, অনেক ভাড়াটিয়াকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছেন। এসব নিয়ে নানা জটিলতা হচ্ছে। এসব সমস্যার আশু সমাধান কাম্য। করোনা-সংকটে অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়িয়েছেন অনেকে। কোথাও বসেছে ‘মানবতারবাজার’। কোথাও মাত্র এক টাকায় খাদ্যপণ্য কিনতে পারছেন গরিব মানুষ। কোথাও অসহায়দের সহায় হয়েছে ‘মানবতারঘর’? তাই ‘মানবিকসমাজ’ গঠনে আমাদের যতটা সম্ভব সহনশীল হওয়া উচিত।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়