সীমান্তের ওপার থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও অবিরাম বর্ষণে সৃষ্ট বন্যায় ক্ষতির মুখে পড়েছে আউশ ও আমনের আবাদ। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলে এই ক্ষতির পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। এবার বোরো মৌসুমে ধানের ভালো দাম পেয়ে কৃষক আউশ, আমন নিয়েও স্বপ্ন দেখছিল; কিন্তু হঠাত্ এই বন্যায় তারা দিশেহারা হয়ে পড়েছে। বন্যায় আউশের অনেক খেত পানির নিচে তলিয়ে গেছে। নষ্ট হয়ে গেছে আমনের বীজতলা। বাদ যায়নি সবজিখেতও।
সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশে বোরোর পর প্রধান ফসল আমন ও আউশ। কোনোভাবে এ দুইটি ফসল মার খেলে করোনা ভাইরাস সংকটের এ সময় দেশের খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়বে। তাই বন্যার এই আঘাত মোকাবিলায় সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।
চলতি ২০২০-২১ অর্থবছরে ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৫৬৬ হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছে। যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৭ হাজার হেক্টর বেশি। শুধু তাই নয়, গত অর্থবছরের চেয়ে এবার ২ লাখ হেক্টর বেশি জমিতে আউশের আবাদ হয়েছে। গত ২০১৯-২০ অর্থবছরে ১১ লাখ ৩৪ হাজার হেক্টর জমিতে আউশ আবাদ হয়েছিল। উত্পাদন হয়েছিল ৩০ লাখ ১২ হাজার টন। আর চলতি অর্থবছরে উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৬ লাখ ৪৪ হাজার ৮০০ টন চাল।
এদিকে আউশের পাশাপাশি এবার রেকর্ড পরিমাণ প্রায় ৫৯ লাখ হেক্টর জমিতে ১ কোটি ৫৬ লাখ টন আমন চাল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল; কিন্তু হঠাত্ বন্যায় লক্ষ্যমাত্রা পূরণ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
রংপুর থেকে স্টাফ রিপোর্টার গোলাম মোস্তফা আনছারী জানান, বন্যায় রংপুর অঞ্চলের পাঁচ জেলায় প্রায় ৫ হাজার হেক্টর জমির আমন বীজতলা, আউশের খেত, শাকসবজি, চীনাবাদাম ও তিল ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানি দীর্ঘস্থায়ী ও জলাবদ্ধতা হলে এসব ফসল কৃষকরা ঘরে তুলতে পারবেন না।
তিস্তা ব্যারাজের উপসহকারী প্রকৌশলী (পানি শাখা) এ এস এম আমিনুর রশিদ জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া ব্যারাজের সব গেট খুলে রাখায় ভাটি এলাকার খালিশা চাঁপনী ও বাইশপুকুর চর প্লাবিত হয়ে বাড়িঘর বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। উত্তরাঞ্চলের পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রধান প্রকৌশলী জ্যোতি প্রসাদ ঘোষ জানান, ভারতে ভয়াবহ বন্যা হওয়ায় এর প্রভাব বাংলাদেশে পড়েছে।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোহাম্মদ আলী জানান, যেসব ফসলের খেত নিমজ্জিত হয়েছে সে সবের তালিকা করে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করা হচ্ছে।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি ফজলে ইলাহী স্বপন জানান, বন্যায় জেলার ৯ হাজার ৭৮৯ হেক্টর জমির বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে জেলার অনেক আমন বীজতলা ও আউশের খেত পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলার উলিপুরে পানি বৃদ্ধির কারণে প্রায় ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিস্তা নদীর বাম তীর রক্ষায় নির্মিত টি-বাঁধটিতে ভাঙন দেখা দিয়েছে। যে কোনো মুহূর্তে বাঁধটি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেলে পার্শ্ববর্তী গ্রামের শত শত বাড়িঘর ও ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে।
কুড়িগ্রাম সদরের পাঁচগাছী ইউনিয়নের কৃষক মজিদ মিয়া জানান, তার আমন সম্পূর্ণ বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। ইতিমধ্যেই বীজতলা নষ্ট হয়ে গেছে, পানি নেমে গেলেও তা রক্ষা হবে না। বীজতলা নষ্ট হয়ে যাওয়ায় চিন্তায় পড়েছেন, কীভাবে জমিতে আমন আবাদ করবেন?
কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. মো. মোস্তাফিজুর রহমান প্রধান জানান, বন্যায় বিভিন্ন ফসলের খেত পানিতে তলিয়ে থাকায় তা আবার নতুন করে কৃষকদের রোপণ করতে হবে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নিমজ্জিত ফসলের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পাবে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি এস এম শফিকুল ইসলাম জানান, বন্যায় জেলার বিভিন্ন এলাকার আমন বীজতলা, রোপা আউশ, চীনাবাদাম, ভুট্টা ও সবজিখেত পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ শামিম আশরাফ জানান, বন্যার কারণে সৃষ্ট ফসলের ক্ষয়ক্ষতি এখন পর্যন্ত নিরূপণ করা যায় নি। আগামী সপ্তাহে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা যাবে। তিনি জানান, বন্যার কারণে আমন বীজের চাষসংকট নিরসনের জন্য জেলার পাঁচটি উপজেলার তিন একর জমিতে আমন বীজতলা তৈরির জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এ দিকে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃষক চাষাবাদে ঝাঁপিয়ে পড়বে বলে তিনি জানান।
এদিকে কৃষি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, করোনা ভাইরাস সংকটের এ সময়ে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবারই প্রথম আমন চাষে কৃষককে বীজে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে। আমন উত্পাদন বৃদ্ধির জন্য কম ফলনশীল জাতের আবাদ কমিয়ে আধুনিক/উফশি জাতের সমপ্রসারণ ও হাইব্রিড জাতের এলাকা বৃদ্ধির কার্যক্রম চলছে। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে আউশ ধানবীজ, আমন ধানবীজ, পাটবীজ, সার, সেচসহ বিভিন্ন প্রণোদনা কৃষকের মধ্যে সুষ্ঠুভাবে বিতরণ করা হয়েছে।
হঠাত্ বন্যায় আউশ, আমনের ক্ষতি প্রসঙ্গে কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বলেছেন, প্রতি বছরই বন্যার কারণে আউশ ও আমনের ফলন নষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বিশেষ করে বন্যার কারণে আমন ফসলটি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। এক্ষেত্রে সম্ভাব্য ক্ষতি মোকাবিলায় সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। বিকল্প বীজতলা তৈরি, নিয়মিতভাবে আবহাওয়া মনিটরিং, ভারতের সঙ্গে যোগাযোগসহ সব প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে যাতে করে বন্যার কারণে ফসলের ক্ষতি মোকাবিলা করা যায়।