দেশীয় ফল ও পরিবর্তিত মানসিকতা

ষড়্ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। ঋতু পরিবর্তনের এমন বৈচিত্র্য বিশ্বের কম দেশেই পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর অনেক দেশেই শীত আর গ্রীষ্ম ছাড়া আর বিশেষ কিছু অনুভূত হয় না। কিন্তু আমরা  শীত ও  গ্রীষ্মের পাশাপাশি শরত্, হেমন্ত, বর্ষা ও বসন্ত উপলব্ধি করি, উপভোগও করি। প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ফুল ও ফলে আসে বৈচিত্র্য। প্রকৃতি মহা পরিকল্পনায় সাজাইয়াছে আমাদের বিভিন্ন জনপদ।  যেহেতু ঋতুর বৈচিত্র্য আছে, তাই আমাদের এই অঞ্চলে ফুল ও ফলের বৈচিত্র্যও  বিস্ময়কর। বত্সরের সর্বসময় ফল থাকিলেও বিশেষ করিয়া জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় মাসে বাজার ভরিয়া উঠে নানা জাতের ফলে। একটি বিষয় আমরা গভীরভাবে ভাবিলে দেখিতে পাইব, সর্বত্র  কমন কিছু ফল থাকিলেও প্রকৃতি তথা সৃষ্টিকর্তা নির্দিষ্ট জনপদের মানুষের জন্য নির্দিষ্ট ফল উপহার দিয়াছেন। যেমন লটকন, অথবা গাব, অথবা বাঙ্গি। উহা বিশ্বের বহু দেশেই নাই। আবার অ্যাভোকাডো, উহা মেক্সিকো বা মধ্য আমেরিকার ফল। বাংলাদেশ উহার জন্মভূমি নহে। অথবা চেরি, উহাও এই অঞ্চলের ফল নহে, নারিকেল  বা তাল ইউরোপের ফল নহে।

কিন্তু বর্তমান বিশ্ব যোগাযোগ নিকটবর্তী হওয়ায় এবং কৃষিপ্রযুক্তি উন্নত হওয়ায় মেক্সিকো বা থাইল্যান্ডের ফল বাংলাদেশে সচরাচর হইয়া গিয়াছে। ফলে ফল ভোগেও দেখা দিয়াছে বিদেশপ্রীতি। বিদেশি ফলের মূল্য অধিক, তাই অনেকেই দেশি ফল খাওয়াটাকে গরিবের কর্ম বলিয়া মনে করিতেছেন। তাহারা চেরি ফল খাইবেন কিন্তু লটকন খাইতে বোধকরি লজ্জা বোধ করেন। ইদানীং তাহারা অভ্যস্ত হইয়া উঠিতেছেন ড্রাগন ফল বা থাইল্যান্ডের ডুরিয়ান ফলে। অথচ যাহা ডুরিয়ান তাহাই বাংলাদেশের কাঁঠাল। কাঁঠাল আকারে বড় আর ডুরিয়ান ছোট। শুধু তাহাই নহে, বাংলাদেশে শুরু হইয়াছে এই সকল ফলের চাষ এবং বিদেশি বিভিন্ন ফলের প্রদর্শনী। অথচ তাহারা এই কথা ভুলিয়া গিয়াছেন যে যেই ভূমিতে জন্মগ্রহণ করিয়াছেন, সেই ভূমির ফল তাহাকে অধিক প্রাণশক্তি জোগাইয়া থাকে। শতশত বত্সর ধরিয়া তাহার শরীরের জেনিওলজি তথা বংশবৃত্তান্ত এই দেশীয় ফলের সঙ্গে পরিচিত ও সংগতিপূর্ণ।

আমরা বিদেশি ফলের বিরোধিতা করিতেছি না। বিভিন্ন ফল দেশে প্রবেশ করিলে এবং সেই সকলের চাষাবাদ করিলে আমাদের ফলভোগেও বৈচিত্র্য আসিবে। কিন্তু দেশি ফল না খাওয়ার বোকামি কেন শুরু হইতেছে!  উহা কেবলই এক ধরনের নূতন মানসিকতা, যাহা হাস্যকর। দৈনিক ইত্তেফাকে প্রথম পৃষ্ঠায় একটি ছবি প্রকাশ পাইয়াছে—বিক্রেতা পাকা লটকন লইয়া ঘুরিতেছেন। আমরা প্রায় নিশ্চিত যে এই লটকন কোনো ধনাঢ্য ব্যক্তি গাড়ি দাঁড় করাইয়া কিনিবেন না। কারণ তাহার ঘরে আছে আপেল অথবা ড্রাগন ফল। আমাদের মনে রাখিতে হইবে, সকল দেশের ফলই উপকারী ও সুস্বাদু। খাইতেও আপত্তি নাই। কিন্তু তাহা ভোগ করিতে গিয়া আমরা যেন অধিক কারবাইড খাইয়া না ফেলি।