দেশের সর্ব দক্ষিণে অবস্থিত একমাত্র প্রবাল রাজ্য সেন্টমার্টিন দ্বীপ। দ্বীপটির অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্ব দিকে। আয়তন খুব বেশি নয়, মাত্র সাড়ে ৮ বর্গকিলোমিটার। দ্বীপটির নামকরণ হয় ‘ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’র শাসনামলে। জনৈক ইংরেজ মি. মার্টিনের নামানুসারে দ্বীপের নামকরণ হয় ‘সেন্টমার্টিন দ্বীপ’। এটি টেকনাফ উপজেলাধীন ইউনিয়ন। টেকনাফ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। বিশ্বের দুর্লভতম প্রবাল রাজ্যের একটি হচ্ছে সেন্টমার্টিন দ্বীপ। এখানে রয়েছে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ২০০ প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ, ৫ প্রজাতির দুর্লভ কাছিম, ১৫ প্রজাতির সাপ, ১৮৭ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ১২০ প্রজাতির পাখি (দেশি ও পরিযায়ী মিলিয়ে), ৫ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৫ প্রজাতির টিকটিকি-গিরগিটি, ১৯ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী, ১৫৩ প্রজাতির সামুদ্রিক শৈবাল রয়েছে। রয়েছে পাথুরে শিলা ও হরেক রকম শৈবালের রাজ্য। এছাড়াও অসংখ্য নারিকেলগাছ এবং কেয়াবনসহ নানান ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। যার কারণেই সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বলা হয়েছে বিশ্বের দুর্লভতম স্থানের একটি। বিশেষকের মতে, এত স্বল্প আয়তনের আর কোনো স্থানে এমন নৈসর্গিক দৃশ্য ও বহুল প্রজাতির উদ্ভিদ বা জীব প্রজাতির সন্ধান পাওয়া যায় না।
এতদ সব লোভনীয় কারণে সেন্টমার্টিনে দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে আর্কষণীয় হয়ে উঠছে। জানা যায়, প্রতি বছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখানে প্রায় দেড় লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ ইতিবাচক দিক। এতে আমাদের কারো দ্বিমত নেই বোধকরি। দ্বিমতটা হচ্ছে, পর্যটকদেরকে স্বাগত জানাতে গিয়ে নানান ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সেন্টমার্টিন দ্বীপ পরিবেশগত সংকটে পড়াতে। এ ছাড়াও পর্যটকদের সুবিধার্থে রাতের আঁধারকে দূর করতে জেনারেটর ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে হোটেল ব্যবসায়ীদেরকে। যার ফলে রাতে দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া অনেক প্রজাতির প্রাণী বা মাছ ভয়ে সটকে পড়ছে। বিশেষকরে বিশ্বের দুর্লভ প্রজাতির ‘অলিভ রিডলে টার্টল’ (জলপাইরঙা কাছিম) ভয়ে ডিম পাড়া থেকে বিরত থাকছে। পেটে ডিম নিয়ে কাছিমগুলো পরপর তিন রাত দ্বীপে ওঠে আসার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রতিকূল পরিবেশ থাকায় ওরা অন্যত্র চলে যাচ্ছে। সেখানে গিয়েও ওরা রেহাই পাচ্ছে না, পেটের ভেতর ডিম ফেটে মারা যাচ্ছে। এভাবে জলপাই রঙা কাছিম বিলুপ্তির পথ ধরেছে।
এসব হচ্ছে কিছু পর্যটকের রাত্রি যাপনের নামে বাড়াবাড়ির কারণে। যেমন: উচ্চৈঃস্বরে গান বাজিয়ে কিংবা বারবিকিউ’র আয়োজন করে জীববৈচিত্র্যকে হুমকির সম্মুখীন করছেন তারা। উল্লেখ্য, সেন্টমার্টিন দ্বীপে পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন প্রায় হাজার বিশেক পর্যটকের যাতায়াত রয়েছে। যার কিছু অংশ রাত্রি যাপন করে বিভিন্ন ধরনের নৈরাজ্য সৃষ্টি করছেন। যাতে করে জীববৈচিত্র্য প্রচণ্ড হুমকির মুখে পড়ছে। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের গোচরিভূত হলে সেন্টমার্টিন রক্ষায় গঠিত হয়েছে আন্তঃমন্ত্রণালয় কমিটি। সেই কমিটি প্রায় মাস দুয়েক আগে সিদ্ধান্ত নিয়েছে দিনের বেলায় দ্বীপটিতে ঘুরে বেড়াতে পারবে পর্যটকরা কিন্তু রাত্রিযাপন সম্পূর্ণ নিষেধ। যা চলতি বছরের পহেলা মার্চ থেকে কার্যকর হবে। এছাড়া ছেঁড়াদ্বীপ ও গলাচিপা এলাকা পর্যটকদের জন্য সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে ২০১৮ সালের সপ্টেম্বর থেকেই। যা সত্যি এক যুগোপযোগী সিদ্ধান্ত আমরা বলতে পারি।
অপরদিকে গোদের ওপর বিষফোঁড়া হচ্ছে বহুতল ভবন গড়ার হিড়িক। বিষয়টা পর্যবেক্ষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এ সব ভবনের ওজন বহন করার সামর্থ্য ছোট্ট এ দ্বীপটির নেই। যার ফলে এটি যে কোনো সময়ে সমুদ্রে নিমজ্জিত হতে পারে। জানা গেছে, এটি একটি ভাসমান দ্বীপ। সুদূর মালয়েশিয়ার একটি দ্বীপের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, চামচাকৃতির একটি প্রবাল প্রাচীরের সঙ্গে সেন্টমার্টিন দ্বীপের সংযোগ। সমুদ্রের গভীর তলদেশ দিয়ে প্রাকৃতিকগতভাবে এ সংযোগ স্থাপন হয়েছে, যা প্রবালের জীবাস্ম দিয়েই তৈরি। কাজেই অধিক ওজন বহনের ক্ষমতা নেই দ্বীপটির। অধিক ভার বহনের কারণে যে কোনো সময় ভেঙ্গে যেতে পারে বাঁটটি। আর সে ধরনের কিছু ঘটে গেলে সেন্টমার্টিন দ্বীপের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। কাজেই বিষয়টি মাথায় এনে এখানে বহুতল ভবন তৈরির বিপক্ষেও অবস্থান নিতে হবে কর্তৃপক্ষকে।
আরেকটি বিষয় হচ্ছে, পর্যটকরা ছোট ছোট নুড়ি, শিলাপাথর, প্রবাল, শামুক-ঝিনুক কুড়িয়ে লুকিয়ে-চুকিয়ে নিয়ে আসছে; যা সঠিকভাবে তদারকি হচ্ছে না। এ ছাড়াও পর্যটক দ্বারা পরিবেশের বহুবিধ ক্ষতি সাধন হচ্ছে। যেমন: পলিথিন, বিয়ারের কৌটা, কোমলপানীয় ও প্লাষ্টিকের পানির বোতলসহ নানান ধরনের জিনিস ফেলে আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত করছে। অবস্থান নেওয়া পর্যটকরা রাতে বারবিকিউ’র আয়োজন করে উচ্চৈঃস্বরে গান বাজিয়ে দ্বীপে আশ্রয় নেওয়া প্রাণীকূলকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছে। এতে করে দ্বীপ প্রাণীশূন্য হয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের প্রত্যাশা কর্তৃপক্ষ এ ব্যাপারে আরো সোচ্চার ভূমিকা রাখবেন। পর্যটকদের আগমনকে নিরুত্সাহিত না করে বরং সুন্দর সহনীয় নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে সেন্টমার্টিন দ্বীপকে বাঁচানোর চেষ্টা করবেন। তাহলে সেন্টমার্টিন দ্বীপ টিকে থাকবে শত-হাজার বছর। রক্ষা পাবে জীববৈচিত্র্যও।
n লেখক:কথাসাহিত্যিক ও বন্যপ্রাণী বিশারদ