বাড়ছে ভূগর্ভস্থ পানি দূষণ

জান্নাতুল মাওয়া নাজ 

   

কৃষি, শিল্প, গার্হস্থ্য ব্যবহার এবং পরিবেশ রক্ষণাবেক্ষণসহ মনুষ্যজীবনের সর্বক্ষেত্রেই পানি অপরিহার্য এবং এজন্য অত্যাবশ্যক হলো পরিশোধিত বিশুদ্ধ পানি। পানির প্রধান তিনটি উত্স হলো বৃষ্টির পানি, ভূপৃষ্ঠের ওপরের পানি ও ভূগর্ভস্থ পানি। এর সবকটির ক্ষেত্রেই দূষণ ঘটে। ভূপৃষ্ঠের ওপরের পানি ভূগর্ভস্থ পানির তুলনায় অধিক সংবেদনশীল। যেহেতু ভূগর্ভস্থ পানি প্রাকৃতিকভাবেই ভূপৃষ্ঠের ওপরের ক্রিয়াকাণ্ড থেকে সুরক্ষিত। কিন্তু বহুমুখী দূষণের ফলে সেই পানিও এখন মানুষের মৃত্যুঝুঁকি বাড়াচ্ছে। দূষিত পানি পানের কারণে মানুষ নানা জটিল ও প্রাণঘাতী সংক্রামক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এ পরিস্থিতি ভয়াবহ।

বাংলাদেশে প্রায় শতভাগ গ্রামের মানুষ খাবার পানির জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভর করে। শহর অঞ্চলেও পানির সরবরাহ প্রধানত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল। রাজধানী ঢাকায় মোট সরবরাহের ৮৭ শতাংশের বেশি আসে ভূগর্ভস্থ পানি থেকে, বাকিটা ভূপৃষ্ঠস্থ পানি শোধন করে নেওয়া হয়। রাজধানীতে প্রতিদিন ২২০ থেকে ৩০০ কোটি লিটার পানির প্রয়োজন। গত তিন দশকে ভূগর্ভস্থ পানির জন্য প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়নি। বর্তমানে সারাদেশে বছরে প্রায় তিন কোটি ২০ লাখ মানুষ পানি সংকটে ভুগছে। প্রতিদিন সুপেয় পানির যে চাহিদা রয়েছে, ভূগর্ভস্থ পানি থেকে সেই চাহিদা পুরোপুরি মেটানো সম্ভব নয়। অপরিকল্পিতভাবে পানি উত্তোলনের কারণে প্রতি বছরই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। পানির স্তর নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে ভূগর্ভস্থ খাবার পানির সঙ্গে নলকূপে উঠে আসছে ক্ষতিকর ভারী ধাতু ও দূষিত পদার্থ। যা পান করার ফলে মানুষ বিভিন্ন রোগে ভুগছে।

ভূগর্ভ থেকে উঠে আসা বিশুদ্ধ পানির প্রতিটি ফোঁটাই অমূল্য সম্পদ। গবেষকরা বলছেন, প্রতি বছর প্রায় ১০ ফুট করে নেমে যাচ্ছে পানির স্তর। এ শূন্যস্থান পূরণে রাজধানীর আশপাশের নদী ও অন্যান্য জলাশয় থেকে যে পরিমাণ পানি ভূগর্ভে জমা হচ্ছে, তা উত্তোলনের তুলনায় অনেক কম। তাছাড়া দীর্ঘদিন ধরে দূষণকবলিত এসব জলাশয়ের বিষাক্ত পানি নেমে গিয়ে দূষিত করছে ভূগর্ভস্থ পানির প্রথম স্তরকে। দ্বিতীয় স্তর রয়েছে ঝুঁকিতে। আর তৃতীয় স্তর এখন পর্যন্ত নিরাপদ থাকলেও ভবিষ্যত্ নিয়ে রয়েছে শঙ্কা। ইতিমধ্যে ঢাকা শহরে ভূগর্ভের প্রথম স্তরে নাইট্রেট, সালফেট, মার্কারি, সিসা, আর্সেনিক ও নানান জৈব কণার উপস্থিতি লক্ষ করছেন গবেষকরা। চাপকল দিয়ে প্রথম স্তরের পানি তোলা হলেও মোটরচালিত অগভীর নলকূপ দিয়ে দ্বিতীয় ও গভীর নলকূপ দিয়ে তৃতীয় স্তর থেকে তোলা হচ্ছে বিশুদ্ধ পানি। প্রথম স্তরের দূষণের কারণে রাজধানীর নদী তীরবর্তী এলাকায় চাপকলের পানি এখন অনেকটাই পানের অযোগ্য। ভূগর্ভস্থ পানিতে দূষণের বিষয়টি রীতিমতো ভাবিয়ে তুলেছে বিজ্ঞানীদের। স্বস্তিতে নেই ওয়াসা। সুপেয় পানির সুরক্ষাকে চ্যালেঞ্জ হিসেবেই দেখছেন দায়িত্বশীলরা। ধারণা করা হচ্ছে, নদীগুলোকে দূষণমুক্ত করে কাজে লাগানো না হলে কয়েক দশকের মধ্যে সুপেয় পানির অভাবে বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়তে পারে ঢাকা।

ভূগর্ভস্থ পানি ভূপৃষ্ঠের দূষণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। অসংখ্য প্রাকৃতিক এবং মানুষের বিভিন্ন ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ ঘটাচ্ছে। প্রতিটি শিল্পকারখানার সঙ্গে শোধনাগার বা অ্যাফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) স্থাপন বাধ্যতামূলক। কৃষিজমিতে কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে আনতে হবে। ভূগর্ভস্থ পানি রক্ষণাবেক্ষণের লক্ষ্যে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা উচিত। মনে রাখতে হবে ভূগর্ভস্থ পানি সীমিত। বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে ব্যবহার করতে পারলে আমরা পানির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির দূষণ রোধ করতে পারব।

শিক্ষার্থী, এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড

ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল

ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ