কঠিন সময় পার করছে চলনবিলের হস্তশিল্পীরা

সিরাজগঞ্জ, পাবনা ও নাটোর জেলার মোট আটটি উপজেলার চলনবিল এলাকার অর্ধলক্ষাধিক হস্তশিল্পী পরিবার রয়েছে চরম দুর্ভোগে। করোনার কারণে কর্মহীন হওয়ায় এসব হস্তশিল্পী পরিবারের অন্তত ৩ লাখ মানুষ অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। প্রায় তিন মাস কোনো কাজ না থাকায় সামান্য সঞ্চয়ও শেষ। ‘ফেয়ার প্রাইসের’ ১০ টাকা কেজি দরের চাল কেনার সংগতিও নেই এদের অধিকাংশ পরিবারের। এরা এখনো পায়নি কোনো প্রণোদনা। কর্মহীন এসব পরিবারের প্রধানরা এখন চোখে অন্ধকার দেখছেন।

সম্প্রতি সরেজমিনে এসব ভুক্তভোগী কামার, কুমার, কাঠমিস্ত্রি, তাঁতি, শাঁখারি, বাঁশ-বেত, নকশিকাঁথা, পাটের ছিকে, চটের ব্যাগ, কাগজের ঠোংগা ও শীতলপাটি শিল্পীসহ বিভিন্ন ট্রেডের কারিগর ও কুটির শিল্পের হস্তশিল্পী ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের এ কষ্টের কথা জানা গেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল কর্মকর্তারাও হস্তশিল্পীদের দুর্ভোগে থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন। তবে বিসিক কর্মকর্তারা এসব হস্তশিল্পী ও শ্রমিকদের পর্যায়ক্রমে খাদ্য সহায়তা দেওয়ার দাবি করলে তারা কোনো ধরনের সহায়তা পাননি বলে জানান।

রায়গঞ্জ উপজেলার আটঘরিয়া গ্রামের শীতলপাটির কারিগর কীর্তন দে বলেন, আমাদের শীতলপাটির কদর থাকলেও আমাদের কোনো কদর নেই। তিন মাস কোনো কাজ নেই, অর্ডার নেই কীভাবে এখন আমরা বাঁচি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি ইত্তেফাককে বলেন, ‘কাঠের পোকা যেমন কাঠ খেয়ে বেঁচে থাকে, আমরাও তেমনি বেঁচে আছি’। শীতলপাটি তৈরির কাজ করেন ঐ গ্রাম ও পার্শ্ববর্তী দরবস্ত গ্রামের মোট ১৫০ পরিবারের অন্তত ৫৫০ শিল্পী ও কারিগর। উপজেলার ধানগড়া পালপাড়ায় মাটির প্রতিমা তৈরির দক্ষ কারিগর রঞ্জিত পাল বলেন, মাটির কাজ করতে করতে জীবনটাই মাটি করে ফেলেছি। দিনরাত খেটে সংসারে বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, সন্তানদের নিয়ে কোনোমতে এতদিন খেয়ে পরে বেঁচে ছিলাম। এখন আর বেঁচে থাকার কোনো উপায় নেই। এছাড়াও তাড়াশ ও রায়গঞ্জের বিপুলসংখ্যক আদিবাসী নারী-পুরুষ বাঁশ, বেত, সুতলি, বিন্নার ফুল, তালপাতা আর খেজুরপাতা দিয়ে নিপুণভাবে তৈরি করেন বিভিন্ন ব্যবহার্য সামগ্রী। আর মালাকাররা তৈরি করেন ‘ফুলশোলা’ বা ‘ভাতশোলা’র বিয়ের মুকুট, মালা ও পূজার সাজ। এখন কারো ঘরেই নেই বেঁচে থাকার মতো সঞ্চয়। 

নাটোরের গুরুদাসপুর উপজেলার নজিপুর পালপাড়া গ্রামের মৃিশল্পী লিটনপাল, বাসুদেব পাল, কালিনগর শিকারপাড়া গ্রামের বাঁশ-বেত শিল্পী আবুল সরদার, পরিমল দাস, সিংড়া উপজেলার বাঁশ-বেত শিল্পী জব্বার আলী, রুহুল প্রামানিক, পাবনার চাটমোহরের মৃিশল্পী অরবিন্দ কুন্ডু, গীতাপাল, গোষ্ঠ, স্বপন, নিশাত পাল, সুবোধ পাল, বাঁশ-বেত শিল্পী নারায়ণ দাস, মায়া দাস, সিরাজগঞ্জের তাড়াশের চরকুশাবাড়ী গ্রামের নকশিকাঁথা শিল্পী নাসরিন, ফাতেমা ও শিল্পী খাতুন উল্লাপাড়া উপজেলার মৃিশল্পী রতন পাল, বাঁশ-বেত শিল্পী নজরুল ইসলাম জানান, আমরা সারা বছর বিভিন্ন নিত্যব্যবহার্য জিনিস তৈরি করে হাটবাজার ও মেলায় বিক্রি করে থাকি। এতে কোনোমতে ডালভাত খেয়ে আমাদের জীবন চলত। করোনার কারণে সব মেলা বন্ধ। হাট-বাজারে বেচাকেনা নেই, কোনো কাজের বায়নাও নেই। যা কিছু সঞ্চয় ছিল; ঘরে বসে খেয়ে তাও শেষ। সকলের খাবার, দুধের শিশুদের দুধ ও বাড়ির বয়স্ক ব্যক্তির ওষুধ কিনতে পারছি না। কেউ এখন ধারকর্জও দিচ্ছে না। এখন আমরা কীভাবে বাঁচব। অনুরূপ সমস্যার কথা জানালেন রায়গঞ্জের তাঁত শিল্পাঞ্চল কুটারগাঁতী, হামিনদামিন ও লক্ষ্মীকোলা গ্রামের সহস্রাধিক তাঁত শিল্পী ও শ্রমিকেরা। অসহায় কর্মহীন নিরন্ন ভুক্তভোগী হস্তশিল্পীরা সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।