আগামী তিন দিন দেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া ভারতের আসাম, মেঘালয় পাদদেশীয় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহার প্রদেশে একই মাত্রায় বৃষ্টি হতে পারে। অতিরিক্ত এই বর্ষণের ফলে দেশের কয়েকটি জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টা সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলার বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে। তিস্তা ও ধরলা নদীসমূহের পানি আগামী ৭২ ঘণ্টায় সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে। আগামী ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করতে পারে। এছাড়া ব্রহ্মপুত্র-যমুনা, দেশের উত্তরাঞ্চলের তিস্তা-ধরলা এবং উত্তর পূর্বাঞ্চলের মেঘনা অববাহিকার প্রধান নদীসমূহের পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশ ও ভারতের আবহাওয়া অধিদপ্তরের গাণিতিক আবহাওয়া মডেলের তথ্য পর্যালোচনা করে এমন পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এদিকে নদনদীর পানি বৃদ্ধিতে এক সপ্তাহের ব্যবধানে নতুন করে আবার বন্যার কবলে পড়েছে বেশকিছু এলাকা। সুনামগঞ্জের নদী তীরবর্তী এলাকায় দ্বিতীয় দফা বন্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ। নীলফামারীর ডিমলায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে শত শত পরিবার। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ২০ হাজার মানুষ।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু সক্রিয় রয়েছে এবং এর বর্ধিতাংশ বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত বিস্তৃত। এর প্রভাবে আজ শনিবার রাজশাহী, রংপুর, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ জায়গায় এবং ঢাকা, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের অনেক জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি/বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেইসঙ্গে দেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় তেঁতুলিয়ায় ১২০ মিলিমিটার, টাঙ্গাইলে ৭০ মিলিমিটার, ঈশ্বরদী ও সীতাকুন্ডে ৫৭ মিলিমিটার, বগুড়ায় ৫৫ মিলিমিটার, রাঙ্গামাটিতে ৫৩ মিলিমিটার, সৈয়দপুরে ৫০ মিলিমিটার, কতুবদিয়ায় ৪৭ মিলিমিটার, খেপুপাড়ায় ৪৬ মিলিমিটার ও ঢাকায় সামান্য বৃষ্টি হয়েছে।
সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে আবারও বন্যার কবলে পড়েছে সুনামগঞ্জ জেলা। গত দুই দিনে অতিবৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুরমা, যাদুকাটা, চেলানদী, চলতি নদীর পানিসহ জেলার সবকটি নদনদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। সুরমা নদীর পানি ষোলঘর পয়েন্ট দিয়ে বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে সুনামগঞ্জ সদর, তাহিরপুর, বিশ্বম্ভরপুর, দোয়ারাবাজার, ছাতক এবং জামালগঞ্জের নদী তীরবর্তী এলাকা তলিয়ে গেছে। দ্বিতীয় দফা বন্যায় চরম দুর্ভোগে পড়েছে সাধারণ মানুষ।
সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জানান, আগামী তিন-চার দিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকবে, তাই বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। সুরমাসহ সবকটি নদনদীর পানি বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
এছাড়া জৈন্তাপুর (সিলেট) সংবাদদাতা জানান, জৈন্তাপুর উপজেলায় গত দুই দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় উপজেলার সীমান্ত ঘেঁষা তিন ইউনিয়নসহ সবকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। সারী নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বিপত্সীমার .২১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ সহায়তা প্রদান করতে দেখা যায়নি। আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের গ্রামীণ জনপথ স্কুল, মাদ্রাসা ও মসজিদ এবং বীজতলা। এর মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নিম্ন আয়ের দিনমজুর ও শ্রমিক পরিবারগুলো। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় পানিবন্দি হাওরাঞ্চলের পরিবারগুলোর মধ্যে বিশুদ্ধ পানি ও খাদ্যের অভাব দেখা দিয়েছে।
ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের ফলে তিস্তার পানি বিপত্সীমার ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের ৬ হাজার পরিবারের প্রায় ২০ হাজার মানুষ। শুক্রবার দুপুরে ডালিয়া পয়েন্টে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে ১৫ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। এছাড়া শুক্রবার ২৪.০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় উপজেলার পূর্বখড়িবাড়ীর দিঘিরপাড়, চরখড়িবাড়ী, পশ্চিম টাপুর চর, পাগলীর বাজার, একতার বাজার, বাংলাপাড়া, উত্তর খড়িবাড়ী, পূর্বখড়িবাড়ীর ১৬টি পরিবার এবং পূর্বছাতনাই ইউনিয়নের ঝাড়সিংহেরশ্বর ও পূর্বছাতনাই এলাকার ১ হাজার ৪০টি পরিবার, ঝুনাগাছচাপানী ইউনিয়নের ভেন্ডাবাড়ী ও সাতুনামা এলাকার ৬০টি পরিবার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে। খালিশাচাপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর, ছোটখাতা এলাকার ৮০০ পরিবার, খগাখড়িবাড়ী ইউনিয়নের কিসামত ছাতনাই ও দোহলপাড়া মৌজার তিস্তার চর এলাকার ৪০০ পরিবার এবং গয়াবাড়ী ইউনিয়নের উত্তর গয়াবাড়ী গ্রামের ২২০টি পরিবারসহ মোট ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
ডালিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী (পাউবো) রবিউল ইসলাম বলেন, উজানের ঢল ও ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিস্তা ব্যারাজের সবকটি জলকপাট খুলে দেওয়া হয়েছে এবং আমরা সতর্কাবস্থায় রয়েছি। ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জয়শ্রী রানী রায় বলেন, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদীবেষ্টিত বেশকিছু এলাকার ঘরবাড়িতে বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ হতে বন্যাকবলিত এলাকা সরেজমিন পরিদর্শনসহ সার্বিক পরিস্থিতির বিষয়ে খোঁজখবর রাখা হচ্ছে।
এদিকে গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত দুই দিন স্থির থাকার পর শুক্রবার থেকে ব্রহ্মপুত্র নদসহ যমুনা ও ঘাঘট নদীর পানি আবারও বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে। করতোয়া নদীর পানি কমতে শুরু করলেও তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত আছে। পানি বৃদ্ধি ও হ্রাসের এই সময়ে জেলার নদী তীরবর্তী এলাকাগুলোতে শুরু হয়েছে তীব্র ভাঙন। তবে জেলার সার্বিক বন্যা পরিস্থিতি এখন উন্নতির দিকে। তবে বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, শিশুখাদ্য, পশুখাদ্য, জ্বালানি সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষত বন্যায় কর্মহীন হওয়ার কারণে শ্রমজীবী মানুষের খাদ্য সংকট দেখা দিয়েছে।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মোখলেছুর রহমান মোবাইল ফোনে জানান, গতকাল সকাল ছয়টা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্রের পানি ৪ সেন্টিমিটার ও ঘাঘটের পানি ১ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। অপরদিকে তিস্তা নদীর পানি ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে করতোয়ার পানি ১ সেন্টিমিটার কমেছে। তিনি বলেন এছাড়া জেলায় গতকাল সারাদিন ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে। ফলে জেলার বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশাঙ্ক করা হচ্ছে।