বিশ্বরাজনীতির অতীত এবং বর্তমান অবস্থা

মো. বিপ্লব আলী

ইংল্যান্ডে প্রথম শিল্পবিপ্লব সংঘটিত হওয়ার পর দুইটি প্রধান সমস্যা দেখা দিয়েছিল। কাঁচামালের অভাব ও উদ্বৃত্ত দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয়ের  জন্য বাজার। এই সমস্যা সমাধানের একটা উপায় হলো উপনিবেশ স্থাপন। বাংলাদেশসহ এশিয়া, আফ্রিকা ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে যুক্তরাজ্য উপনিবেশ শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। খনিজ ও বাণিজ্যিক কৃষিতে সমৃদ্ধ ঐ উপনিবেশ থেকে একদিকে কাঁচামাল সংগ্রহ, অন্যদিকে উদ্বৃত্ত দ্রব্যসামগ্রী বিক্রয়ের বাজার সৃষ্টি হয়েছিল। বৃহত্তর ইউরোপে শিল্পবিপ্লবের ছোঁয়া লাগলে একই পথে  ফ্রন্স, রাশিয়া ও জার্মানি বিশ্বব্যাপী উপনিবেশ প্রতিষ্ঠার প্রতিযোগিতা শুরু করে। এমন অবস্থায় ইউরোপের প্রধান শক্তিশালী দেশের মধ্যে ক্ষমতার ঈর্ষা, উগ্র জাতীয়তাবাদ, কূটনৈতিক তত্পরতা, সামরিক অস্ত্র বৃদ্ধি, উপনিবেশ বিস্তার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে যুদ্ধের জল্পনাকল্পনা ঘনীভূত হয়। আর এই প্রেক্ষাপটে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানি ও অস্ট্রিয়ার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে ইংল্যান্ড ও ফ্রান্স বিশ্বব্যাপী কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে। যুদ্ধের ভয়াবহ থেকে রক্ষা ও  বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসনের চৌদ্দ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে লিগ অব নেশন তথা সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু পরবর্তী জাতিপুঞ্জ বিশ্বব্যাপী শান্তি প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতার পরিচয় দেয়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি পরাজয়ের গ্লানি ও ক্ষোভ পুঞ্জীভূত করে এডলফ হিটলার ১৯৩৩ সালে দেশটির চ্যান্সেলর নির্বাচিত হয়।

একই সঙ্গে ইতালিতে বেনিতা মসোলিনির নেতৃত্বে ফ্যাসিবাদের আবির্ভাবের মধ্য দিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সংঘটিত হয়। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মোড়ল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া তথা সোভিয়েত ইউনিয়ন কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে। এই সময় ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের ঔপনিবেশিক শাসন অবসান এবং ওয়াশিংটনের নেতৃত্বে পুঁজিবাদ ব্লক ও মস্কোর নেতৃত্বে সাম্যবাদ ব্লক তৈরির মধ্য দিয়ে বিশ্বরাজনীতি দুইটি শিবিরে বিভক্ত হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের কর্তৃত্ব অব্যাহত রাখতে পরস্পর অস্ত্র প্রতিযোগিতা, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তত্পরতা, উন্নত সামরিক প্রশিক্ষণ, পারমাণবিক ও হাইড্রোজেন বোমা, এমন কি মহাকাশ যুদ্ধের পরিকল্পনার মধ্যে দিয়ে ‘স্নায়ুযুদ্ধের’ সূত্রপাত হয়েছিল। পুঁজিবাদ বিশ্বে সাম্যবাদ আদর্শ প্রতিযোগিতায় ব্যর্থ হলে ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন হয়। সোভিয়েত পতনের পর আমেরিকা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে একচেটিয়া কর্তৃত্ব ও সাম্রাজ্যবাদ প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তী আলোচনায় আসে ২০১১ সালে আরব বসন্ত। আরব রাষ্ট্রসমূহের জনগণ বিভিন্ন দাবিতে যে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ ও আন্দোলন সংঘটিত করে, তাই আরব বসন্ত বা আর রবিউল আরাবি। এই সূত্র ধরে সিরিয়া, ইয়েমেন, ইরাক, লেবানন ও লিবিয়াতে যে সংকট সৃষ্টি হয়েছে তা আজ পর্যন্ত অব্যাহত।

এদিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনীতির দেশ, চীন তার ‘ওয়ান বেল্ট অ্যান্ড ওয়ান রোড’ দ্বারা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে যে রূপরেখা এঁকেছে তা বাস্তবায়ন  হলে বিশ্বের এক-তৃতীয়াংশ দেশ চীনের আওতাধীন আসবে। তখন বেইজিং বিশ্বে প্রভাব বিস্তারে অনেক এগিয়ে যাবে। তাই এই পরিকল্পনা পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থের পরিপন্থি। বর্তমানে চীন যেভাবে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক, প্রযুক্তিগত ও আঞ্চলিক বলয় তৈরি করছে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃত্ব ক্ষয়ে যাওয়ার পথে। সম্প্রতি মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআইর প্রধান ক্রিস্টোফার রে বলেন, ‘চীন আমেরিকার জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। প্রয়োজনে যে কোনো উপায়ে বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হতে চীন তার সমগ্র রাষ্ট্রকে কাজে লাগাচ্ছে। বেইজিং বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি হওয়া সময়ের দাবি, তবে করোনা ভাইরাস, চীন-ভারত সীমান্ত উত্তেজনা, অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ইত্যাদি ইস্যুতে চীন অনেকটাই সমালোচিত। তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পৃথিবীর একমাত্র অর্থনৈতিক ও পরাশক্তি দেশ হলেও বর্তমানে ওয়াশিংটন নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে। আর এই সংকট মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হলে বিশ্বরাজনীতির কর্তৃত্বের পালাবদল হতে পারে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়