যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চীনের হঠাত্ কেন ‘আপসের বার্তা’

চীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বৈরিতার পারদ যখন দিন দিন ওপরের দিকে উঠছে তখন চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ওয়াশিংটনকে লক্ষ্য করে বৃহস্পতিবার দীর্ঘ যে বিবৃতি দিয়েছেন, তা কিছুটা বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে। তার ঐ বিবৃতি দেখে আপাতদৃষ্টিতে একে ‘আপসের বার্তা’ মনে হতে পারে। ওয়াং বলেন, ‘যেটা সত্যি তা হলো চীন কখনোই বিশ্ব পরিসরে যুক্তরাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করতে এবং যুক্তরাষ্ট্রকে হটিয়ে তার জায়গা নিতে আগ্রহী নয়। চীন চায় বিশ্বের দুই বৃহত্তম অর্থনীতি যেন সহযোগিতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করে।’ তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি যুক্তরাষ্ট্র ঠান্ডা মাথায় চীনের ব্যাপারে নিরপেক্ষ, বাস্তবমুখী এবং যৌক্তিক নীতি নেবে। চীন সর্বদা কথা বলতে প্রস্তুত, যদি ওয়াশিংটন সত্যিকারভাবে তা চায়।’

ট্রাম্প প্রশাসন এবং তার পশ্চিমা কিছু মিত্র দেশ যখন শি জিন পিংয়ের চীনকে ‘চরম ঔদ্ধত’ এবং উচ্চাভিলাষী হিসেবে তুলে ধরার অব্যাহত চেষ্টা করে চলেছে, সে সময় চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছ থেকে এ ধরনের আপসমূলক বক্তব্য কেন, তা নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু হয়েছে। হংকংভিত্তিক ইংরেজি দৈনিক দি সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে দেওয়া এক মন্তব্যে সেখানকার চীনা অ্যাকাডেমি অফ সোশ্যাল সায়েন্সের মার্কিন-চীন সম্পর্কের গবেষক লু শিয়াং বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত চীনা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এসব বক্তব্য দিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আগে চীন ওয়াশিংটনকে কিছুটা শান্ত করতে চাইছে। চীনের এই বার্তার লক্ষ্য আমেরিকান ভোটার ছাড়াও আমেরিকান নীতিনির্ধারকরাও। তাদেরকে চীন বলতে চাইছে, শত্রুতার পারদ না বাগিয়ে চীনের সঙ্গে সহযোগিতা করলে তাতে আমেরিকার লাভ হবে, আমেরিকার অর্থনৈতিক পুনরুত্থান অনেক সহজ হবে।’—খবর বিবিসি বাংলার

লু শিয়াংয়ের মতো কুয়ালালামপুরে মালয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব চায়নার অধ্যাপক ড. সৈয়দ মাহমুদ আলীও বলেন, নভেম্বরের নির্বাচনের আগে মার্কিন ভোটার এবং রাজনীতিকদের কথা মাথায় রেখে চীন হয়তো এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমেরিকাতে ডোনাল্ড ট্রাম্পের জেতার সম্ভাবনা নিয়ে যেভাবে সন্দেহ বাড়ছে, চীনারা হয়তো ভাবছে এখন আমেরিকান ভোটারদের বলার সময় যে, চীনের কাছ থেকে তাদের লাভ ছাড়া ক্ষতি হবে না।’ ড. আলী বলেন, কোভিড সংকট মোকাবিলায় সরকারের পারফরমেন্স নিয়ে মার্কিন জনগণের মধ্যে বড় ধরনের অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। এজন্য ট্রাম্প প্রশাসন মানুষকে এটা বোঝানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে যে এতে সরকারের কোনো দায় নেই, সমস্ত সংকটের মূলে চীন এবং সময়মতো চীনকে তারা দেখে নেবেন।

চীনকে দোষারোপ করাটা নির্বাচনে জেতার একমাত্র ওষুধ হিসেবে বিবেচনা করছে ট্রাম্প প্রশাসন। তবে অধিকাংশ বিশ্লেষক মনে করছেন, ওয়াং ইর বার্তায় পরিস্থিতির কোনোই পরিবর্তন হবে না, বরঞ্চ নির্বাচন যত কাছে আসবে হোয়াইট হাউজের ঘনিষ্ঠ লোকজনের মুখ থেকে তত বেশি চীনবিরোধী কথাবার্তা শোনা যাবে। বেইজিংয়ের রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত সাম্প্রতিক এক সমীক্ষা বলছে, সিংহভাগ চীনা গবেষক মনে করেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক এখন এতটাই জটিল হয়ে পড়েছে যে, নতুন একটি শীতল যুদ্ধ এড়ানোর সম্ভাবনা দিনকে দিন অসম্ভব হয়ে পড়েছে।