বন্যা পরিস্থিতি অবনতির আশঙ্কা

প্রবল বর্ষণ ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে দেশের বিভিন্ন স্থানে নদনদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় কয়েকটি জেলায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কা করা হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় সুনামগঞ্জ, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, রংপুর, লালমনিরহাট ও নেত্রকোনা জেলার  বেশ কিছু এলাকা নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে কয়েক লাখ মানুষ। অনেক জায়গায় ভাঙন আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। প্রথমদফা বন্যার পানি নেমে যেতে না যেতেই আবারও বন্যার কবলে পড়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েছেন এসব বানভাসি মানুষ।

গতকাল শনিবার বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের এক বুলেটিনে বলা হয়েছে, সকাল ৯টা পর্যন্ত তিস্তা, যমুনা, সুরমাসহ ছয়টি নদীর পানি অন্তত সাতটি স্থানে বিপত্সীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আগামী ২৪ ঘণ্টায় নীলফামারী, লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, জামালপুর, নাটোর, সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে।

সিলেট অফিস ও সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, এক সপ্তাহের ব্যবধানে ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট ও সুনামগঞ্জে দ্বিতীয়বারের মতো আবার বন্যা দেখা দিয়েছে। সিলেটের চারটি এবং সুনামগঞ্জের ১১টি উপজেলাসহ ১৫টি উপজেলায় এখন থই থই পানি। এই দুই জেলায় ২ লক্ষাধিক লোক পানিবন্দি হয়েছেন। সুনামগঞ্জ জেলা শহরের অনেক বাসাবাড়িতে শনিবার রাতেই পানি ওঠে। পৌর এলাকার বেশ কয়েকটি সড়কের ওপর দিয়ে নৌকা চলতে দেখা যায়।

স্টাফ রিপোর্টার, রংপুর জানান, তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে জেলার তিন উপজেলার প্রায় ১০ হাজার পরিবার বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। গঙ্গাচড়ার পূর্ব বিনবিনা চরের বেড়িবাঁধ ভেঙে বিনবিনাসহ বাগেরহাট, শংকরদহ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। চর এলাকার বিভিন্ন রাস্তা ভেঙে যাওয়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। মানুষজন নৌকা, কলাগাছের ভেলায় অতি কষ্টে চলাচল করছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সুরমা নদীসহ সকল নদনদীতে পানিবৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। পৌরসভাসহ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য মতে, শুক্রবার বিকাল পর্যন্ত সুরমা নদীর পানি ছাতক পয়েন্টে বিপত্সীমার ১৪০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, ব্রহ্মপুত্র, ধরলা ও তিস্তার পানি বৃদ্ধি অব্যাহত থাকায় জেলায় দ্বিতীয়দফা বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। নদনদীর অববাহিকার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চলগুলোতে পানি ঢুকে পড়ায় দুর্ভোগে পড়েছেন মানুষজন। শনিবার বিকালে ধরলার পানি সেতু পয়েন্টে বিপত্সীমার ৭ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। রাজারহাট উপজেলার ছিনাই ইউনিয়নের কালুয়া এলাকার বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভাঙনের হুমকিতে পড়েছে।

গঙ্গাচড়া (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, ফুলে ফেপে ফুঁসে উঠেছে রাক্ষুসী তিস্তা। গঙ্গাচড়ায় আবারও নতুন করে দেখা দিয়েছে বন্যা। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৫ হাজার পরিবার। বাগেরহাট আশ্রয়ণ কেন্দ্র পানিতে তলিয়ে গেছে। শংকরদহ গুচ্ছগ্রামে ভাঙন তীব্র হয়েছে। চরের বাড়িগুলোর চারপাশে শুধু পানি আর পানি। রাস্তাঘাট তলিয়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। 

পীরগাছা (রংপুর) সংবাদদাতা জানান, নতুন করে তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপজেলার ছাওলা ইউনিয়নের গাবুড়া, জুয়ান, রামশিং, শিবদেব ও হাগুরিয়া হাশিম গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, তিস্তা নদীর পানি ডালিয়া পয়েন্টে বিপত্সীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার চারটি উপজেলার ১৪টি ইউনিয়নের তিস্তা তীরবর্তী অঞ্চলের ১৭ হাজার ৫০টি পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি গেট খুলে দেওয়া হয়েছে।

নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, জেলার কলমাকান্দা উপজেলা এবং দুর্গাপুরে ফের বন্যা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে বেশ কিছু এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে। বাসাবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। দুর্গাপুরের সোমেশ্বরী নদীর পানি এবং কলমাকান্দার উব্দাখালি নদীর পানি বিপত্সীমার ২০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, দ্রুতগতিতে যমুনা নদীর পানি বাড়ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এরই মধ্যে জেলার কাজীপুর, সদর, বেলকুচি, শাহজাদপুর ও চৌহালী উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। আগামী দুই-এক দিনের মধ্যে যমুনা নদীর পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে নিম্নাঞ্চলে ফের বন্যার আশঙ্কা করছে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড।

গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ঘাঘট ও করতোয়া নদীর পানি বেড়েছে। ফলে নদী তীরবর্তী যেসব এলাকা থেকে পানি নামতে শুরু করেছিল, সেগুলোতে আবারও পানি বাড়ছে।

ডিমলা (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, নতুন করে বন্যায় পানিবন্দি হয়ে পড়েছে উপজেলার পাঁচটি ইউনিয়নের  প্রায় ২৫ হাজার মানুষ। শতাধিক পরিবার পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধে আশ্রয় নিয়েছে।