জাতীয় পার্টি (জাপা) একাদশ জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল হিসেবেই ভূমিকা পালন করবে। দলটির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ গতকাল শুক্রবার এক বিবৃতিতে এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছেন। পাশাপাশি তিনি বলেছেন, এবার জাপার কোনো সংসদ সদস্য মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত থাকবেন না। এছাড়া পদাধিকার বলে দলের পার্লামেন্টারি পার্টির প্রধান হিসেবে এরশাদ এবার বিরোধী দলীয় নেতা হবেন এবং তার ছোট ভাই ও দলের কো-চেয়ারম্যান জিএম কাদের হবেন সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা। ‘সবার অবগতির জন্য’ শিরোনামে দলের সর্বস্তরের নেতা-কর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে দেওয়া এসব সিদ্ধান্ত সম্বলিত বিবৃতিতে এরশাদের স্বাক্ষর রয়েছে।
একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২২টি (দলগতভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ) আসন পাওয়া জাপা প্রধান বিরোধী দল হবে, না আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের শরিক হিসেবে শুধু সরকারে থাকবে, নাকি দশম সংসদের মতো প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার পাশাপাশি সরকারের সঙ্গে মন্ত্রিসভায়ও থাকবে- এনিয়ে দলের ভেতর-বাইরে ও রাজনৈতিক অঙ্গনে পাঁচদিন ধরে আলোচনা চলার মধ্যেই গতকাল এসব সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিলেন এরশাদ। অথচ আগেরদিনই শপথ নিয়ে সংসদ ভবনে জাপার পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকে দলটির নবনির্বাচিত এমপিরা বেশিরভাগ প্রায় অভিন্ন কণ্ঠে বলেছেন, জাপা আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোটগত নির্বাচন করেছে একসঙ্গে সরকার গঠনের লক্ষ্যে, বিরোধী দলে বসার জন্য মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাপার নেতারা ভোটারদের কাছে ভোট চাননি। এই যুক্তি দেখিয়ে তারা বৃহস্পতিবার বলেছেন, মহাজোটের শরিক হিসেবে জাপা মহাজোটের সরকারেই থাকতে চায়, বিরোধী দল কারা হবে কী হবে না সেটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কিংবা সরকার দেখবে।
এরশাদের ব্যক্তিগত সচিব ও জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য মেজর (অব.) খালেদ আখতার গতকাল রাতে ইত্তেফাককে জানান, একাদশ সংসদে জাপার অবস্থান সম্পর্কে ঘোষিত সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে আজ শনিবার জাতীয় সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে চিঠি পাঠাবেন এরশাদ। এব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য এরশাদ তার চিঠিতে স্পিকারকে অনুরোধ জানাবেন। অবশ্য গতকালের বিবৃতিতেও নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়ে এব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য স্পিকারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন এরশাদ।
জানা গেছে, একাদশ সংসদের সদস্য হিসেবে এরশাদ আগামীকাল রবিবার স্পিকারের কাছে শপথ নিতে পারেন। অসুস্থতার কারণে বৃহস্পতিবার তিনি শপথ নিতে পারেননি। এরশাদের ঘনিষ্ঠজনরা ইত্তেফাককে জানান, তার শারীরিক অবস্থা তেমন ভালো নয়। একা একা উঠতে-বসতে ও হাঁটাচলায় তার সমস্যা হচ্ছে। এজন্য গাড়ি থেকে নেমে হুইল চেয়ারে করে তিনি সংসদ ভবনের ভেতরে সরাসরি স্পিকারের কার্যালয়ে গিয়ে শপথ নেবেন।
বৃহস্পতিবার সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জাপার পার্লামেন্টারি পার্টির সভায় সভাপতিত্ব করেন দলের সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান ও দশম সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ। জাপার একাধিক এমপির সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বৈঠকের শুরুতেই রওশন এরশাদ বলেছেন, ‘দশম সংসদে বিরোধী দলে ও সরকারে একসঙ্গে থাকা নিয়ে দেশে-বিদেশে আমরা অনেক সমালোচিত হয়েছি। আমার মনে হয় এবার আমদের শুধু বিরোধী দলে থাকাই ভালো হবে। তাছাড়া দুই-তিনজন মন্ত্রিসভায় থাকলে এতে দলের নেতা-কর্মীদেরও কোনো উপকারে আসে না। এরচেয়ে শুধু বিরোধী দলে থাকাই ভালো।’ রওশনকে সমর্থন দেন ঢাকা-৬ আসন থেকে এবারও নির্বাচিত জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ। তবে বর্তমান মন্ত্রিসভায় থাকা জাপার এক-দুইজন সদস্য এবারও বিরোধী দলের পাশাপাশি মন্ত্রিসভায়ও থাকার পক্ষে বক্তব্য রাখেন। এনিয়ে বৈঠকে বেশ কিছুক্ষণ পরস্পরের মধ্যে বচসাও হয়।
বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টারি পার্টির ওই বৈঠকের পর জাপার কো-চেয়ারম্যান ও দলে এরশাদের ভবিষ্যত্ রাজনৈতিক উত্তরসূরী জিএম কাদের ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘আমাদের আজকের বৈঠকের সিদ্ধান্ত হল- মহাজোটের শরিক হিসেবে আমরা সরকারেই থাকতে চাই।’ গতকাল এরশাদের সিদ্ধান্তের পর জিএম কাদের ইত্তেফাককে বলেন, ‘এরশাদ সাহেব যেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটাই চূড়ান্ত, এটা খুব ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি। পার্টির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার পার্টির চেয়ারম্যানের রয়েছে।’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ডেকে এই সিদ্ধান্তটি নিতে পারলে ভালো হতো। তবে যেহেতু এরশাদ সাহেব একইসঙ্গে দলের চেয়ারম্যান ও পার্লামেন্টারি বোর্ডেরও প্রধান সেই হিসেবে তিনিই বিরোধী দলের সংসদীয় দলের প্রধান হবেন এটাই স্বাভাবিক। তাছাড়া নিয়ম হলো গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পার্টির চেয়ারম্যান বা প্রেসিডিয়াম যেই সিদ্ধান্ত নেবে সেটিই কার্যকর করবে পার্লামেন্টারি পার্টি।’
এরশাদের গতকালের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে জাপার মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা ইত্তেফাককে বলেন, ‘দলের গঠনতন্ত্রের ৩৯ ধারা অনুযায়ী পার্টি চেয়ারম্যান যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। সেই মোতাবেক এরশাদ সাহেব যে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন সেটি আমাদের সবাইকে মানতে হবে। দল করতে হলে চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত সবাইকে মেনে নিতে হবে।’ এক প্রশ্নের জবাবে রাঙ্গা বলেন, পরে হয়ত পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠক ডেকে এরশাদের সিদ্ধান্ত অনুমোদন করিয়ে নেওয়া হবে, এতে কোনো সমস্যা নেই। ঢাকা-৪ আসন থেকে আবারও নির্বাচিত জাপার সংসদ সদস্য সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা ইত্তেফাককে বলেন, ‘আমি মনে করি দলের চেয়ারম্যানের সিদ্ধান্ত সঠিক। তার এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকার ও বিরোধী দল উভয়েরই ইমেজ বাড়বে।’
এদিকে, এরশাদ এবার নিজেকে বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবেও ঘোষণা করায় জাপার ভেতরে নানামুখী আলোচনা শোনা যাচ্ছে। কেউ কেউ বলছেন, এনিয়ে স্ত্রী রওশনের সঙ্গে আবারও বিবাদ সৃষ্টি হতে পারে এরশাদের। অবশ্য বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টারি পার্টির বৈঠকেও উপস্থিত দলীয় এমপিদের উদ্দেশে রওশন বলেছেন, ‘যদি আপনারা সবাই চান তাহলে আবারও বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে আমি দায়িত্ব পালন করতে চাই, এতে আমার কোনো আপত্তি নেই।’ বৈঠক শেষে এই সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে রওশন ইত্তেফাককেও বলেছিলেন, ‘আমি আবারও বিরোধী দলীয় নেতা হতে পারি, সেই সম্ভাবনা তো আছেই।’ উল্লেখ্য, দশম সংসদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দেওয়ার পরে সংসদ সদস্য হয়ে শপথ নিয়েছিলেন এরশাদ। তখনও তিনি নিজেই বিরোধী দলীয় নেতা হতে চেয়েছিলেন। তবে তখনকার প্রেক্ষাপটে রওশনের প্রভাব এবং দলের এমপিদের সিংহভাগ রওশনের পক্ষে একাট্টা থাকায় বিরোধী দলীয় নেতা হতে পারেননি এরশাদ।
অন্যদিকে, নিজেকে বিরোধী দলীয় নেতা ঘোষণার পাশাপাশি ছোট ভাই জিএম কাদেরকে সংসদের বিরোধী দলীয় উপনেতা হিসেবেও ঘোষণা দিয়েছেন এরশাদ। তবে দশম সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ও স্ত্রী রওশনের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দেননি তিনি। এরশাদ-রওশনের পৃথক অবস্থানের কারণে দশম সংসদে কাউকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করতে পারেনি জাপা। প্রথমে কাজী ফিরোজ রশীদকে উপনেতা করার জন্য স্পিকারকে চিঠি দিয়েছিলেন রওশন, এর বিরোধিতা করে তখন জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলুকে উপনেতা করার জন্য স্পিকারকে পাল্টা চিঠি দেন এরশাদ। পরবর্তীতে আবার এরশাদ ও রওশন সম্মিলিতভাবে ফিরোজ রশীদকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করার জন্য স্পিকারকে চিঠি দিলেও শেষ পর্যন্ত তা আর কার্যকর হয়নি। ফলে বিরোধী দলীয় উপনেতা ছাড়াই পাঁচ বছর অতিক্রম করেছে জাপা। এর আগে নবম সংসদের প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও নিজেদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে কাউকে বিরোধী দলীয় উপনেতা করতে পারেনি।