বন্যা মোকাবিলায় আমরা প্রস্তুত তো?

হাসিবুল হাসান শান্ত

প্রতি বছরই আমাদের দেশের কিছু কিছু অঞ্চল বন্যায় প্লাবিত হয়। বন্যার পানিতে প্রতি বছর দেশের উত্তরপূর্বাঞ্চল প্লাবিত হয়। পাশাপাশি নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বর্তমান সময়ে নদীর পানি বৃদ্ধি একটি বড়সড় বন্যার পূর্ভাবাস দিচ্ছে আমাদের। বাংলাদেশের অধিকাংশ এলাকা সমুদ্র সমতল হতে মাত্র ১০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত। সমুদ্র সমতল থেকে ১ মিটার পানি বৃদ্ধি পেলেই এদেশের ১০ শতাংশ এলাকা নিমজ্জিত হবে বলে ধারণা করা হয়। এ বছর পানি বৃদ্ধির পেছনে রয়েছে বৈশ্বিক আবহাওয়ার প্রচ্ছন্ন প্রভাব। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অতিবৃষ্টি ও হিমালয় পর্বতে বরফগলা পানি সমসাময়িক সময়ে বন্যার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যার পানি হিমালয় পর্বতমালার ঢাল বেয়ে প্লাবিত করছে পাদদেশীয় সমভূমিসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন এলাকা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে সমুদ্রস্তরের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে ক্ষতিগ্রস্তের বিচারে বিশ্বব্যাপী গবেষকগণ বাংলাদেশকে পোস্টার চাইল্ড (Poster Child) হিসেবে আখ্যা দিয়ে থাকেন।

সরকারের ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, বর্তমানে দেশের ১৪টি জেলার প্রায় সাড়ে ৩ লাখ মানুষ বন্যার পানিতে বন্দি অবস্থায় আছে। বন্যার কারণে ঘর ও ফসলের ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৪ লাখ মানুষের। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত জেলা হচ্ছে জামালপুর, গাইবান্ধা ও সুনামগঞ্জ। বন্যায় আক্রান্ত অন্য জেলাগুলো হচ্ছে মানিকগঞ্জ, রাজবাড়ী, মাদারীপুর, সিলেট, টাঙ্গাইল, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী। এ বছরের বন্যা নিয়ে অতিরিক্ত উদ্বিগ্নতার কারণ হচ্ছে এবারের বন্যার ধরনটা একটু আলাদা বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। জুনের শেষে বা জুলাইয়ের মাঝামাঝি সময়ে যে বন্যা হয় তা ১০-১৫ দিনের মতো স্থায়ী হয় কিন্তু এবার নিয়মের ব্যত্যয় দেখা গিয়েছে। এরই মধ্যে পদ্মার দুই পারের চার জেলা, উত্তরাঞ্চলের বন্যার পানি চলে এসেছে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে আত্রাই নদের পানি বিপত্সীমা অতিক্রম করে নওগাঁ, জয়পুরহাট ও বগুড়ার আরো বিস্তৃত এলাকায় ছড়াতে পারে। কয়েক সপ্তাহে দেশের ২৩ জেলার মানুষ বন্যাকবলিত হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যদিও বর্তমানে নদীর পানি বিপত্সীমার নিচে রয়েছে, তবে সামনে ভয়াবহ বন্যার আশঙ্কা কোনোভাবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। পরিস্থিতি এখন অনুকূলে থাকলেও সামনে ভারী বৃষ্টিপাতে তলিয়ে যেতে পারে দেশের নিম্নাঞ্চলসহ বেশ কিছু জেলা। বন্যার পাশাপাশি নদীভাঙন এ যেন দুর্বিষহতার আরেক রূপ। এ বছর নদীভাঙনে ২ হাজার ৩৬৫ হেক্টর এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। গবেষণা সংস্থা বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) এমন পূর্বাভাস দিয়েছে। এতে ১৬টি এলাকার প্রায় ২৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হবে। জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক জাতিসংঘের আন্তঃসরকার প্যানেলের (আইপিসিসি) চতুর্থ মূল্যায়ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, এই শতকের মধ্যে বাংলাদেশের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ডুবে যেতে পারে। দেশের ১৯টি জেলার প্রায় ৬০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে আছে। এর ফলে প্রায় ২ কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারে।

একে তো করোনায় দেশ নাস্তানাবুদ, তার ওপর বন্যার আবির্ভাব। সুতরাং আসন্ন বন্যা পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে আমাদের বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতি গ্রহণ করা প্রয়োজন। কোরবানির ঈদ সামনে থাকায় গরুর খামারিরা বেকায়দায় পড়বে। তাদের আগে থেকেই সতর্ক থাকতে হবে। কিছুদিন পর আমন ধান রোপণের মৌসুম। এ বিষয়টিতে কৃষক ভাইদের নজর দিতে হবে। বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পর্যাপ্ত শুকনো খাবার, যেমন—চিড়া, মুড়ি, গুড়, খই ইত্যাদি মজুত রাখতে হবে। বিশুদ্ধ খাবার পানি সংরক্ষণের জন্য চৌবাচ্চার ব্যবস্থা করতে হবে। পানিবাহিত বিভিন্ন রোগ (ডায়রিয়া ও উদারাময়) এবং প্রাথমিক চিকিত্সা সরঞ্জাম সংরক্ষণ করতে হবে। সরকার এরই মধ্যে বন্যাদুর্গত এলাকার স্কুল-কলেজ অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে খুলে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে যাওয়ার আগে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকতে হবে। বাঁধ নির্মাণ এবং বন্যাপ্রবণ এলাকার ৫ কোটি অধিবাসীর জন্য নির্মাণাধীন ১৫৩টি আশ্রয়কেন্দ্রের কাজ দ্রুত শেষ করতে হবে।। করোনার এ সময়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে পর্যাপ্ত সুরক্ষা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আমাদের বন্যা মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।

n লেখক:শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়