জমি দখল, মাদক ব্যবসা ও অপহরণে জড়িত রোহিঙ্গারা

উখিয়া-টেকনাফে প্রায় ১৫ লক্ষাধিক রোহিঙ্গার কারণে ৮ হাজার একর বনাঞ্চল ধ্বংস হয়েছে। এখানকার পাহাড় ও বনাঞ্চল উজাড় করে ফেলেছে। যাদের জন্য উখিয়া-টেকনাফে এত ত্যাগ শিকার করা হয়েছে তারাই এখন নানা অপরাধ করে বেড়াচ্ছে। রোহিঙ্গারা আশ্রয় নেওয়ার পর তাদের মূল চাহিদা ছিল খাদ্য এবং চিকিত্সা। বিনামূল্যে খাবার পায় তারা, কোনো কাজ করারও দরকার পড়ে না। ক্যাম্পগুলোতে অর্ধেকেরও বেশি যুবক। ফলে তাদের মধ্যে অপরাধ প্রবণতা বাড়ছে। রোহিঙ্গাদের অনৈতিক কর্মকাণ্ড, স্থানীয়দের বাস্তুভিটা জবর দখল, অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি, ক্যাম্প এলাকায় রোহিঙ্গাদের আধিপত্য বিস্তার—প্রভৃতি বিষয় নিয়ে ক্যাম্প এলাকায় বসবাসরত স্থানীয়রা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ করেছে।

কুতুপালং ক্যাম্প ইনচার্জের (সিআইসি) কাছেও একটি অনুলিপি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, গত ছয় মাস ধরে কুতুপালং রেজিস্ট্রার্ড ক্যাম্পের ক্যাম্প ইনচার্জ যোগদান করার পর থেকে রোহিঙ্গারা স্থানীয়দের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উসকানিমূলক কথাবার্তা ও অনধিকার হস্তক্ষেপ করে আসছে। এমনকি ২৫০/৩০০ রোহিঙ্গা উশৃঙ্খল যুবক কুতুপালং ডি-৪ এলাকায় স্থানীয় এক হতদরিদ্র মফিজ উদ্দিনের বসতবাড়ি ভাঙচুর করে মালামাল লুটপাট করে।

এ ঘটনায় রাজাপালং ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি বেলাল উদ্দিনের নেতৃত্বে একটি সংবাদ সম্মেলন করা হয়েছে। এখান থেকে ক্যাম্প ইনচার্জের অপসারণ দাবি করা হয়েছে। তবে ক্যাম্প ইনচার্জ খলিলুর রহমান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, স্থানীয় কিছু লোকের অনৈতিক আবদার রক্ষা করতে না পারায় তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় কুত্সা রটনা করে বেড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ক্যাম্পের পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় তিনি সচেষ্ট আছেন।

জানা গেছে, রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ এখন রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে পড়েছে। এর আগে তারা ইয়াবা বহন করলেও এখন তারা নিজেরাই ইয়াবা সরবরাহ করছে। এ কাজ করতে গিয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে ইয়াবাসহ আটক ও বন্দুকযুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে অনেকে। সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমার থেকে ইয়াবা এনে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দিচ্ছে রোহিঙ্গা নারী-পুরুষরা। পুলিশ যে ইয়াবা কারবারির তালিকা করেছে সেখানেও রোহিঙ্গাদের নাম রয়েছে।

র্যাব-১৫ সূত্র জানিয়েছে, গত ছয় মাসে ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে ১০ লাখ পিস। গ্রেফতার হয়েছে ১৮৭ জন। আর র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছেন ১০ জন। মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তারা বলেছেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গারা আসার পর থেকেই ইয়াবার পাচার বেড়ে গেছে। গত চার বছরে অনেক বেশি ইয়াবার চালান ও পাচারকারী ধরা পড়েছে। গত ৬ জুলাই দিবাগত রাতে টেকনাফের হ্নীলার ওয়াব্রাং গ্রামের নাফ নদের তীর সাঁতরিয়ে ইয়াবা নিয়ে অনুপ্রবেশকালে বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে দুই রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৫০ হাজার ইয়াবা, একটি চায়না পিস্তল ও দুই রাউন্ড কার্তুজ।

টেকনাফ-২ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল ফায়সাল হাসান খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। কক্সবাজার ৩৪ বিজিবি ব্যাটালিয়ন সূত্রে জানা গেছে, জানুয়ারি থেকে ১০ জুলাই পর্যন্ত চোরাচালান ও মাদকবিরোধী অভিযানে সাড়ে ৩ কোটি টাকা মূল্যের ১১ লাখ ৪১ হাজার ২৯৭ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে ও ৮৯ জন আসামি আটক করা হয়। এছাড়া বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৯ জন ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে।

সর্বশেষ ৯ জুলাই ভোর ৪টার দিকে উখিয়া উপজেলার রাজাপালং ইউনিয়নের তুলাতলী জলিলের ঘোনা ব্রিজের কাছে বিজিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে তিন রোহিঙ্গা নিহত হয়েছেন। এ সময় ৩ লাখ পিস ইয়াবা, দুটি দেশীয় পাইপগান ও পাঁচ রাউন্ড কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। টেকনাফ থানার ওসি প্রদীপ কুমার দাশ জানিয়েছেন, টেকনাফে পুলিশের সঙ্গে গোলাগুলিতে দুই মাদক কারবারি নিহত হয়েছেন। ৭ জুলাই ভোরে টেকনাফ হোয়াইক্যং ইউনিয়নের পশ্চিম মহেশখালীয়া পাড়ার কম্বনিয়া এলাকায় এ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থল থেকে অস্ত্র, গুলি ও ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। চলতি বছরের জুন মাস থেকে গতকাল পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৬০ জন নিহত হয়েছে। তার মধ্যে ২৬ জন সক্রিয় ডাকাত ছিল বলে জানা যায়। বাকিরা রোহিঙ্গা মাদক কারবারি।

কক্সবাজার র্যাব ১৫-এর অধিনায়ক উইং কমান্ডার আজিম আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অপরাধ দমনে র্যাবের প্রতিনিয়ত অভিযান চলছে। পাশাপাশি মাদক পাচারে জড়িত বেশ কয়েক জন রোহিঙ্গাকে আটক করা হয়েছে। র্যাবের সঙ্গে গুলি বিনিময়ের ঘটনাও ঘটেছে। টহল জোরদার করেছে র্যাব। উখিয়া থানার ওসি মর্জিনা আক্তার মর্জু বলেন, রোহিঙ্গা ক্যাম্প পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। নিয়মিত টহল ও অভিযান জোরদার করেছে পুলিশ। কঠোর অবস্থান ও নজরদারিতে রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।