করোনার প্রায় ১৫ হাজার ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট তৈরির অভিযোগে জাতীয় হূদরোগ ইনস্টিটিউটের কার্ডিয়াক সার্জন ডা. সাবরিনা আরিফ চৌধুরী গ্রেফতার হয়েছেন। গতকাল রবিবার দুপুরে ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে শ্যামলী শিশু মেলা ক্রসিংয়ে অবস্থিত তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার কার্যালয়ে ডেকে নেয় পুলিশ। সেখানে উপ-কমিশনার হারুনুর রশিদ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। ঘন্টা দুয়েক জিজ্ঞাসাবাদ শেষে উপ-কমিশনার তাকে গ্রেফতার দেখিয়ে তেজগাঁও থানায় পাঠিয়ে দেন। সরকারি চাকরি করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকা এবং অর্থ আত্মসাতের মতো শাস্তিযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত হওয়ায় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় তাকে সাময়িক বরখাস্ত করেছে।
তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার হারুন অর রশিদ গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, সোমবার (আজ) সাবরিনাকে আদালতে নেওয়া হবে। তাকে রিমান্ডে নেওয়ার আবেদন করবে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের পর করোনার ভুয়া টেস্ট রিপোর্ট তৈরির সঙ্গে আর কে কে জড়িত রয়েছে সে সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যাবে। এর আগে করোনা ভাইরাস পরীক্ষার নামে জালিয়াতির অভিযোগে জেকেজির যেসব সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাদের সবাই বলেছেন সাবরিনাই জেকেজির চেয়ারম্যান। তাছাড়া তিতুমীর কলেজে জেকেজির বুথে হামলার অভিযোগ উঠলে সাবরিনাই প্রতিষ্ঠানটির মুখপাত্র হিসেবে সংবাদমাধ্যমে বক্তব্য দেন। অভিযানের একদিন আগে তিনি নিজে ওই প্রতিষ্ঠান থেকে সরে যান। সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে তিনি কখনই কোনো প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের দায়িত্বপালন করতে পারেন না। করোনার নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে সাবরিনা তার দায় এড়াতে পারেন না।
সাবরিনার স্বামী আরিফুল হক চৌধুরীকে যে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে, সাবরিনাকেও সেই একই মামলার আসামি করার প্রক্রিয়া চলছে।
আইইডিসিআরের অনুমোদন নিয়ে জেকেজি হেলথ কেয়ার ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে করোনার নমুনা সংগ্রহের জন্য ৪৪টি বুথ স্থাপন করে। এসব এলাকা থেকে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ জনের নমুনা সংগ্রহ করা হতো। শর্ত ছিল-সরকার নির্ধারিত ল্যাবরেটরিতে নমুনা পাঠাতে হবে। গুলশানের কনফিডেন্স টাওয়ারের ১১, ১৪ ও ১৫ তলায় জেকেজি হেলথ কেয়ারের অফিস। কিন্তু আরিফুল ও তার স্ত্রী ডা. সাবরিনা বুকিং বিডি ও হেলথ কেয়ার নামে দুইটি প্রতিষ্ঠান চালু করেন। ডা. সাবরিনা সুলতানা ও তার স্বামী আরিফুল চৌধুরীর নিজস্ব কর্মীবাহিনী ছাড়াও সিন্ডিকেটে যোগ দেয় দালালচক্র। জেকেজি হেলথ কেয়ার নামের একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তারা ২৭ হাজার করোনা রোগীর নমুনা সংগ্রহ করে কোনো রকম পরীক্ষা ছাড়াই ১৫ হাজার ৪৬০টি মনগড়া ভুয়া রিপোর্ট দিয়েছে। বাকি ১১ হাজার ৫৪০টি রিপোর্ট দিয়েছে আইইডিসিআরের মাধ্যমে। জেকেজির গুলশানের অফিস থেকে ১৫ হাজার ৪৬০টি ভুয়া রিপোর্ট দিয়ে এই দম্পতি হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় ৮ কোটি টাকা।
গত ২৩ জুন তেজগাঁও থানা পুলিশ জেকেজি হেলথ কেয়ারের আরিফুল চৌধুরী, হুমায়ুন কবীর, হুমায়ুনের স্ত্রী তানজিনা পাটোয়ারিসহ ৬ জন কে গ্রেফতার করে। গুলশানে পুলিশের ওই অভিযান চলাকালে ডা. সাবরিনা সুলতানা পালিয়ে যান। ওই ৬ জনকে তেজগাঁও থানায় নিয়ে আসা হয়। ওই দিন রাতেই আরিফুলের ক্যাডার বাহিনী আসামিদের ছিনিয়ে নিতে তেজগাঁও থানায় হামলা চালায়। ওই ঘটনায় পুলিশ ১৮ জনকে গ্রেফতার করে। পরদিন আদালতে হুমায়ুন কবীর ও তার স্ত্রী তানজিনা এ ঘটনায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়। আরিফুলসহ ৪ জনকে পুলিশ ২ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে।
জেকেজি প্রতিষ্ঠানের সিইও আরিফ চৌধুরীর নামে জালিয়াতি, সরকারি কাজে বাধা, পুলিশের ওপর হামলাসহ আরও কয়েকটি অভিযোগে চারটি মামলা করেছে পুলিশ। এসব মামলার কোনোটিতেই আসামি করা হয়নি প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ডা. সাবরিনা চৌধুরীকে। মামলার তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, প্রথমদিকে সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা খুঁজে পাওয়া না গেলেও পরে তার সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসছে। ইতিমধ্যে রিপোর্ট জালিয়াতি, তিতুমীর কলেজে চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সংবাদকর্মীদের ওপর হামলায় সাবরিনার সংশ্লিষ্টতা মিলেছে।
ডা. সাবরিনা চৌধুরী স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ থেকে চিকিত্সাবিদ্যায় ডিগ্রী নেন। আরিফ চৌধুরীর তিনি চতুর্থ স্ত্রী।