চট্টগ্রামে আলোচনায় এবার উপজেলা নির্বাচন

সংসদ নির্বাচন শেষ হতে না হতেই এবার পঞ্চম উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে চট্টগ্রামে আলোচনা শুরু হয়েছে। চলতি মাসের শেষ সপ্তাহ অথবা আগামী মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হতে পারে- এমন খবরে অনেকটা আগেভাগেই তত্পর হয়ে উঠেছেন চট্টগ্রামের ১৫ উপজেলার সম্ভাব্য প্রার্থীরা। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সর্বস্তরেই এখন উপজেলা পরিষদের প্রার্থিতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।

এ দিকে, নির্বাচন কমিশন থেকে এখনো উপজেলা পরিষদ নির্বাচন নিয়ে সুনির্দিষ্ট কিছু জানানো না হলেও সব ধরনের প্রস্তুতি নিয়ে রাখা আছে বলে জানিয়েছেন, নির্বাচন কর্মকর্তারা। তারা জানিয়েছেন, গতবারের মতো এবারো কয়েকধাপে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার সময়সূচির ওপর ভিত্তি করেই নির্বাচন কমিশন তফসিল ঘোষণার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলেও জানা গেছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিনিয়র নির্বাচন কর্মকর্তা মো. মুনীর হোসাইন খান জানিয়েছেন, ‘মাত্র জাতীয় নির্বাচন শেষ হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কিছু কাজ গুছানো আছে। তবে কমিশন সিদ্ধান্ত দিলে আমরা উপজেলা নির্বাচনের কর্মকাণ্ড শুরু করবো। আমাদের সব ধরনের প্রস্তুতি আছে।’

প্রথমবারের মতো এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে। যে কারণে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সম্ভাব্য প্রার্থীরা এ নির্বাচনকে টার্গেট করে তত্পরতা শুরু করেছে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে এ নির্বাচনকে ঘিরে আগ্রহ বাড়তে শুরু করেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন উপজেলায় দলীয় মনোনয়ন নিয়ে নেতাদের মধ্যে মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। 

নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, আইন অনুসারে উপজেলা পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠানের দিন থেকে পাঁচ বছর উপজেলা পরিষদের মেয়াদ। এ মেয়াদ শেষ হওয়ার আগের ১৮০ দিনের মধ্যে যেকোনো দিন নির্বাচন অনুষ্ঠানের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। 

২০১৪ সালে ছয় ধাপে চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেসময় ১৯ জানুয়ারি প্রথম ধাপের উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে ইসি। ১৯ ফেব্রুয়ারি থেকে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন শুরু হয়ে ১৮ মে পর্যন্ত চলে। এরমধ্যে প্রথম ধাপে ১৯ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয় ধাপে ২৭ ফেব্রুয়ারি, তৃতীয় ধাপে ১৫ মার্চ, চতুর্থ ধাপে ২৪ মার্চ, পঞ্চম ধাপে ৩১ মার্চ ও ষষ্ঠ ধাপে ১৮ মে উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

দলীয় সূত্রগুলো জানায়, জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি হওয়ার পর অনেকটা বেকায়দায় পড়েছে বিএনপি। সে হিসেবে নিরঙ্কুশ বিজয় অর্জনের পর অনেকটা ভালো অবস্থানে আছে আওয়ামী লীগ। আগামী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনেও এর প্রভাব পড়বে। বিগত উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত অনুসারী নেতারা ছয়টি উপজেলায় নির্বাচিত হয়েছিলেন। যে কারণে এবারো উপজেলা নির্বাচনে তারা আত্মবিশ্বাস নিয়েই প্রার্থী হতে চাইবেন। দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার প্রভাবে আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সিনিয়র নেতাই উপজেলা চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হতে চান। এতে দলের ভেতরে-বাইরে নেতাদের মধ্যে মান-অভিমান বাড়ছে।

গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আনোয়ারায় আওয়ামী লীগের তৌহিদুল হক চৌধুরী, বাঁশখালীতে জামায়াতের অধ্যক্ষ জহিরুল ইসলাম, বোয়ালখালীতে আওয়ামী লীগের আতাউল হক, চন্দনাইশে এলডিপির (পরে আওয়ামী লীগে যোগ দেন) আবদুল জব্বার চৌধুরী, ফটিকছড়িতে আওয়ামী লীগের তৌহিদুল আলম চৌধুরী, হাটহাজারীতে বিএনপির মাহবুবুল আলম, লোহাগাড়ায় জামায়াতের ফরিদ উদ্দিন, মিরসরাইয়ে বিএনপির নুরুল আমিন, পটিয়ায় বিএনপির মোজাফ্ফর আহমদ চৌধুরী টিপু, রাঙ্গুনিয়ায় আওয়ামী লীগের মো. আলী শাহ, রাউজানে আওয়ামী লীগের এহেছানুল হায়দার চৌধুরী বাবুল, সাতকানিয়ায় জামায়াতের জসিম উদ্দিন, সীতাকুন্ডে আওয়ামী লীগের এস এম আল মামুন, সন্দ্বীপে আওয়ামী লীগের মাস্টার মোহাম্মদ শাহজাহান, কর্ণফুলীতে আওয়ামী লীগের ফারুক চৌধুরী নির্বাচিত হয়েছিলেন। এর মধ্যে বাঁশখালীর জহিরুল ইসলাম ও মিরসরাইয়ের নুরুল আমীন উপজেলা চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করে জাতীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে জামানত হারিয়েছেন।

দলীয় নেতাকর্মীদের মতে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একতরফা নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাঘরিষ্ঠতা অর্জন করেছিল। এর মাসখানেক পরেই অনুষ্ঠিত চতুর্থ উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন উপজেলায় বিএনপি-জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা জয়লাভ করে। এবারো একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে বিএনপি-জামায়াতের। আগামী উপজেলা নির্বাচনে এর প্রভাব না পড়লে একটি প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচন হবে। এ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগকে প্রার্থী বাছাইয়ে অনেক বেশি কঠোরতা অবলম্বন করতে হবে।

প্রসঙ্গত, ১৯৮২ সালে উপজেলা পদ্ধতির প্রবর্তন হয়। ১৯৮৫ সালে প্রথমবারের মতো এবং ১৯৯০ সালে দ্বিতীয়বার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন হয়। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর উপজেলা পদ্ধতি বাতিল করে। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় এসে আবারো উপজেলা পদ্ধতি চালু করে। কিন্তু ওই সময়ে নির্বাচন হয়নি। ২০০৯ সালে তৃতীয়বার ও ২০১৪ সালে চতুর্থবার উপজেলা পরিষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।