মো. আব্দুল বাকী চৌধুরী নবাব
এই বিশ্বে মানবজাতি প্রথম যে বিষয়টি জানে তা হলো গণিত। আর গণিতই অন্যান্য বিষয়গুলো সৃষ্টির পথ সুগম করেছে। উল্লেখ্য যে, মানুষের মস্তিস্কে পারাইটাল লোব বলে একটি অংশ আছে, যার সুবাদে মানুষ বুদ্ধিগত দিক দিয়ে হিসাব-নিকাশের কাজ করে থাকে। যে ভাবেই বলি না কেন, বুদ্ধি বিবেক কথাটি হিসাব-নিকাশের বহির্প্রকাশ মাত্র। আর হিসাব-নিকাশের আবরণী হলো গণিত। পশু-পাখির চেয়ে মানুষের অতিরিক্ত যে নিয়ামক হিসেবে সংযোজন হয়েছে; তা হলো যৌক্তিক বুদ্ধি-বিবেক তথা র্যাশনালিটি (Rationality) আর এটিকে প্রকারান্তরে হিসাব-নিকাশের সরণি ধরে পরিচালনা করে থাকে।
মূলত গণিত কথাটি উদ্ভব হয়েছে, “গণনা করা” কার্যক্রম থেকে। এখানে কথাটি এই দাঁড়ায় যে বিশেষ কৌশলগত জ্ঞান দ্বারা গণনা করা, যা গণিত বলে অভিহিত। যদি সূক্ষ্মভাবে চিন্তা করা যায়। তাহলে প্রতীয়মান হয় যে, হিসাবের সুত্রপাত হয়েছে কোন কিছুর পার্থক্য (Difference) থেকে। এক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন বস্তু ও প্রাণীর শ্রেণিগত বৈশিষ্ট্য প্রণিধানযোগ্য। কেননা একই ধরনের (Homogenous) বস্তু বা প্রাণী হলে হিসাবের এত ধারার আবশ্যকতা হতো না। তখন গণিতের গতিময়তা অনেকটা ধীর গতিতে চলতো। কিন্তু ভিন্নধর্মী (Heterogeneous) হওয়ায় একের পর এক গণিতের শাখা-প্রশাখার বিস্তার এগিয়ে দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে মানুষের অনুসন্ধিত্সা মন খাটো করে দেখার অবকাশ নেই। এই গণিত তুলনামূলক অন্য শাস্ত্রের চেয়ে প্রাচীন ও আদি ভিত্তি। আসলে গণিত বা অংকশাস্ত্রের ইংরেজি হলো ম্যাথমেটিক্স (Mathematics), এই শব্দটি এসেছে গ্রীক শব্দ ম্যাথিন থেকে। আর এর বাংলার অর্থ হলো শিক্ষা গ্রহণ করা। মূলত এটি পরিসর ও সংখ্যা সম্পর্কিত বিজ্ঞান। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, গণিত কথাটি গুণন বা গুণিত হিসেবে সচরাচর ব্যবহার করা হলেও এটি সর্বক্ষেত্রে বিভিন্ন আঙ্গিকে বিদ্যমান। এ প্রেক্ষাপটে অনেকে এটিকে “Mother of all sciences or subjects” বলে গণ্য করে থাকে। এদিকে এর স্বপক্ষে প্রাচীন শাস্ত্র বেদে গণিত বলে কথাটি বহু জায়গায় উল্লেখ আছে। এক্ষেত্রে দেখা যায় যে, বেদের একটি অংশ হলো “বেদাঙ্গ”। আর বেদাঙ্গে গণিত বিজ্ঞানকে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, ভারতের আওতাধীনে সমগ্র বঙ্গে গণিত শাস্ত্রের মৌলিক বিষয় উন্নয়ন ঘটেছিল বৌদ্ধ ও জৈন যুগে (৫০০ খৃস্ট পূর্বাব্দ হতে ৫০০ খৃস্টাব্দ পর্যন্ত)। এদিকে বৌদ্ধ শাস্ত্রাদিতে গণিতকে প্রাথমিক ভাবে তিনটি উপ-বিভাগের উপর দাঁড় করিয়ে রাখা হয়েছে, যেমন-
i) মুদ্রা (নড়ানো বা সঞ্চালন), যা আঙ্গুলের সাহায্যে গণনাযোগ্য (হাতের দশটি আঙ্গুলের বিশটি কড়)।
ii) গণনা, যা মনে মনে হিসাবযোগ্য।
iii) সংখ্যায়ন, যা চলমান পদ্ধতির আওতায় গ্রহণযোগ্য। আসলে গণিতের বিষয়ে যাঁর কথা না বললে অসম্পূর্ণ থেকে যায়। শাস্ত্রমতে যতদূর জানা যায়, তিনি হলেন- ইদ্রিস (আঃ), যিনি খৃষ্টান ও ইহুদী ধর্মে হার্মিস এবং হিন্দু ধর্মে ইন্দ্র বলে অভিহিত। তিনি মূলত ৩ (তিন) টি বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন। যেমন-
i) হেকমতে হাকিম; ii) হেকমতে হুকুম এবং
iii) ঐশ্বরিক নবুয়ত প্রাপ্ত।
এ প্রেক্ষাপটে উল্লেখ্য যে, যীশুখৃষ্টের জন্মের প্রায় চার হাজার বছর আগে হযরত ইদ্রিস (আঃ)ই নিজস্ব হেকমতের আবর্তে পদ্ধতিগতভাবে প্রথম গণিত শাস্ত্র প্রবর্তন করেন বলে জানা যায়। অবশ্য এ বিষয়টি ”গণিত বা প্রথম সংখ্যাতত্ত্বের কথা” যার মূল আরবি হলো- আওয়াল উল ইলামি ইলমুল আদাদী। এটি বাহারুল আসানিদ হাদিসে সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে। যাহোক, গণিতের কথা উঠলেই সংখ্যার কথা উঠে। আমরা যে ১ হতে ৯ পর্যন্ত ব্যবহার করি, তা ক্রমবিকাশের মাধ্যমে প্রবর্তন করেছেন গ্রীসের অমর প্রতিভা পিথাগোরাস। চীনা, সনাতনধর্মী, ব্যাবিলনীয় ও মিশরীয়গণ তাদের প্রাত্যহিক জীবনের গুরুত্ব এবং তাগিদেই গণনা ও পরিমাপ পদ্ধতি উদ্ভাবনে সক্রিয় হয়ে পড়েছিল। প্রথম তাত্ত্বিক গণিতবিদ ছিলেন মেলিটাসের ‘থেলেস’। তাঁরই যোগ্য শিষ্য ছিলেন এই পিথাগোরাস। আর পিথাগোরাস বিশ্বাস করতেন যে বিশ্বের সকল বস্তুকেই সংখ্যার আদলে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। তিনি সংখ্যাগুলোকে এই মর্মে ব্যাখ্যা করতেন যে ‘১’ হলো সকল সংখ্যার আদি এবং ভিত্তি। এর পূর্বে কোন সংখ্যা নেই। সেহেতু এই সংখ্যাটির মাধ্যমে তিনি স্বয়ং ঈশ্বর বা সৃষ্টিকর্তাকে ব্যক্ত করতেন। তাই ‘১’ হলো অতি পবিত্র, আদি ও অকৃত্রিম। এদিকে ঈশ্বরের পর ‘২’ কে আকর্ষণীয়া নারীর প্রতীক হিসেবে বিবেচনা করতেন। আর ‘৩’ সংখ্যাটি শক্তিধর পুরুষ এবং ‘৪’ সংখ্যা কে ন্যায়ের প্রতীক বলে মনে করতেন। তত্পর বিবাহর সংখ্যা ‘৫’ (২+৩ যথাক্রমে নারী এবং পুরুষ) তাছাড়া ‘৬’ থেকে ‘৯’ পর্যন্ত চারটি সংখ্যা নিয়ে একটি মজার কাহিনী আছে।
পরের অংশ আগামীকাল