এক গ্রিক দার্শনিক বলেছিলেন, ‘যুদ্ধে যারা জয়ী হয়, তাদের চাইতে যারা পরাজিত হয় এবং তা সাহসের সঙ্গে স্বীকার করে তাদের পরাজয় সাময়িক। তারা জয়ের পথে এগিয়ে থাকে’। ব্রিটেনের চার্চিল তার জীবনের প্রথম নির্বাচনে পরাজিত হয়েছিলেন। জয়ী প্রার্থী তার সঙ্গে করমর্দন করতে গিয়ে দম্ভ প্রকাশ করলে চার্চিল মৃদু হেসে বলেছিলেন, ‘এটা তোমার এবং আমার জীবনের শেষ নির্বাচন নয়, সুতরাং অপেক্ষা করো। দম্ভ প্রকাশের এটা সময় নয়’। পরবর্তী নির্বাচনেই তিনি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছিলেন।
বাংলাদেশের শেখ হাসিনার মধ্যে এই ‘চার্চিলিয়ান কারেজ এন্ড কনফিডেন্স’ (চার্চিলের মতো সাহস ও বিশ্বাস) দেখেছিলাম সেই ১৯৮৬ সালেই। এরশাদের আমলের সেই নির্বাচনে পরাজিত হয়ে তিনি বিনা প্রতিবাদে পরাজয় স্বীকার করে সংসদে বিরোধী দলের নেতৃত্ব নিয়েছিলেন। ড. কামাল হোসেন তখন তার দলের বর্ষীয়ান নেতা। তার তীব্র বিরোধিতার মুখেও তিনি পরাজয় মেনে সংসদে যোগ দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনে নানা কারচুপির সাহায্যে এরশাদ সাহেব জয়ী হয়েছিলেন। শেখ হাসিনা ইচ্ছা করলে সেই কারচুপির প্রতিবাদ করে সংসদ বর্জন করতে পারতেন।
তার আগে ১৯৯১ সালে বিএনপি’র নির্বাচন বিজয় ছিল মার্জিনাল এবং বিতর্কিত। হাসিনা সেই পরাজয়ও নম্র শিরে মেনে নিয়ে খালেদা জিয়াকে সরকার গঠন করতে দিয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে গিয়ে বসেছিলেন। পরাজয়ের জন্য তিনি কোনো বিদেশি দূতাবাসে নালিশ জানাতে ছোটেননি, আত্মমর্যাদা ও জাতীয় মর্যাদাবোধ (National pride) বিসর্জন দেননি। বরং সেই ১৯৯১ সালেই সংসদের ভেতরের ও বাইরের শক্তিকে ঐক্যবদ্ধ করে তাদের দাবির মুখে খালেদা জিয়াকে প্রেসিডেন্সিয়াল পদ্ধতি থেকে পার্লামেন্টারি পদ্ধতিতে ফিরে আসতে বাধ্য করেছিলেন।
সেবারেই কলকাতার ইংরেজি দৈনিক ‘দ্য স্টেটসম্যান’-এর এক প্রতিবেদক (সম্ভবত মানস ঘোষ) মন্তব্য করেছিলেন, ‘শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে গেলেন। বার বার পরাজয়কে স্বীকার করার এই যে সাহস এবং ধৈর্য তা কেবল টেকসই রাজনৈতিক নেতৃত্বের মধ্যেই দেখা যায় যা পরে জাতীয় নেতৃত্বে (national leadership) পরিণত হয়। পিতা নিহত হওয়ার পর হাসিনা যখন দলের হাল ধরেন, তখন মনে হয়েছিল এই তরুণ অনভিজ্ঞ নেতৃত্ব দুর্যোগ কবলিত বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকবে না। কিন্তু তার জীবনের প্রথম নির্বাচনেই তিনি প্রমাণ করেছেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্যই শুধু নয়, বঙ্গবন্ধুর মতোই জাতীয় নেতৃত্বে উঠে আসার জন্য তিনি এসেছেন।’
কলকাতার ইংরেজি দৈনিক দ্য স্টেটসম্যানের বহুকাল আগের এই মন্তব্যটি কতোটা সঠিক, তার প্রমাণ মিলেছে ২০১৮ সালের ত্রিশে ডিসেম্বরের নির্বাচনে। অবশ্য আগের দু’টি নির্বাচনেও হাসিনা বিজয় মাল্য অর্জন করেছেন। কিন্তু এই বিজয় এনেছে অতীতের দু’তিনটি নির্বাচনে (১৯৮৬, ১৯৯১, ২০০১) পরাজয়ের শিক্ষা, ধৈর্য ও অভিজ্ঞতাই। এই অভিজ্ঞতাই শেখ হাসিনাকে আজ দলীয় নেতা থেকে জাতীয় নেতায় রূপান্তরিত করেছে।
এখানেই বিএনপি হেরে গেছে। শুধু নির্বাচনে নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও। নইলে বাংলাদেশে প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রীর পদে বসে কেন শেখ হাসিনার মতো ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারলেন না বরং ইতিহাস থেকে হারিয়ে যেতে বসেছেন? এর মূল কারণ, এক সেনা অফিসারের স্ত্রী হিসেবে দীর্ঘকাল সেনানিবাসে বসবাসের ফলে গণবিচ্ছিন্নতা এবং গণবিমুখতা। গণতান্ত্রিক রাজনীতি সম্পর্কে অজ্ঞতা এবং সেই অজ্ঞতা প্রসূত দম্ভ।
তিনি নিজের ইচ্ছায় ক্যান্টনমেন্ট ছাড়েননি। রাজনীতির ভাষাও শেখেননি। তার দলের নেতারাও তাকে অনুসরণ করে হুমকি ও অহঙ্কার প্রকাশকে তাদের রাজনীতির ভাষা করে তুলেছেন। ক্ষমতায় এসেই খালেদা জিয়া হুঙ্কার ছেড়েছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ আর ৫০ বছরেও ক্ষমতায় আসতে পারবে না।’ ‘আওয়ামী লীগ সরকার ভারতের তাঁবেদার। তাদের কাছে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ বিক্রি করে দিয়েছে।’
এসব হুমকি ছাড়াও হেফাজতি-অভ্যুত্থানের সময় বেগম জিয়া আওয়ামী নেতাদেরসহ শেখ হাসিনাকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার আল্টিমেটাম দিয়েছিলেন। তার দলের কর্মীদের শ্লোগান ছিল, ‘পঁচাত্তরের পুনরাবৃত্তি ঘটাবো, হাসিনাকে দেশছাড়া করবো।’ এসব হুমকির পাশাপাশি চলেছে হাসিনাকে হত্যা করার ছোট-বড় চক্রান্ত।
এবারের নির্বাচনের আগেও বিএনপির রাজনীতির ভাষা ছিল হুঙ্কার, তর্জন-গর্জনের। তারা মুখে সমঝোতার কথা বলেছেন। আচরণে হিংস্র মূর্তি ধরেছেন। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল তার প্রতিটি নির্বাচনী সভায় হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন, ‘চলতি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পঁচিশ-ত্রিশটির বেশি আসন পাবে না।’ তাদের নতুন দোসর কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগকে নির্বাচনে পাঁচ-ছটির বেশি আসন দেননি। বিএনপির আরেক দোসর মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ দেশ ছেড়ে পালানোর পথ পাবে না। আমরা বিজয় না নিয়ে ঘরে ফিরবো না।’ এসব যে অসার দম্ভ এবং রাজনৈতিক এতিমদের হম্বিতম্বি তা প্রমাণ হতে বেশি দেরি হয়েছে কি?
ড. কামাল হোসেন বিএনপির আদি নেতা নন। আওয়ামী লীগের বিরোধী হলেও তিনি সারা জীবনই ছিলেন গণতান্ত্রিক শিবিরে। বিএনপির সংস্পর্শে গিয়ে তারও রাজনীতির ভাষা বদলে গিয়েছিল। তিনি শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে টিট্কারি দিয়ে বক্তব্য দিতে শুরু করেছিলেন। নির্বাচন-পূর্ব এক আলোচনা সভায় তিনি আওয়ামী লীগকে টিট্কারি দিয়ে বলেন, ‘আপনারাতো নির্বাচনে হেরে যাচ্ছেন, তাই না? তা বিদায়ের আগে কিছু ভালো কাজ করে যান, আমরা সাহায্য করবো।’ এই ভাঁড়ামি কি কোনো প্রবীণ রাজনৈতিক নেতার মুখে সাজে?
এই দম্ভ, অহংকার, গর্জন এবং ভাঁড়ামিও যে ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপি-জামায়াত জোটের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের অন্যতম প্রধান কারণ, বিএনপি নেতারা তা থেকেও শিখছেন না। বিশাল নির্বাচনী পরাজয়ের পর জনগণের কাছে এসে তাদের কাছে পরবর্তী কাজের পন্থা নির্ধারণে সাহায্য ও সহযোগিতা চাওয়ার বদলে তারা ছুটেছেন ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে। মির্জা ফখরুল মার্কিন রাষ্ট্রদূতের কাছে ধরনা দিয়েছেন দেড় ঘণ্টা ধরে।
মার্কিন দূত তাদের জন্য কী করবেন? মৃতপ্রায় লক্ষণের দেহে প্রাণ সঞ্চারের জন্য হনুমান যেমন বিশল্যকরনীর বীজ এনেছিলেন, মৃতপ্রায় বিএনপির দেহে তেমনই প্রাণ সঞ্চারের জন্য রাষ্ট্রদূত কোনো মার্কিনি দাওয়াই দেবেন কি? ট্রাম্প প্রশাসনের কাছ থেকে তার সম্ভাবনা কতোটুকু? নির্বাচনের বহু আগে থেকে ড. কামালের বন্ধু ড. ইউনূস এই মার্কিনি দাওয়াইয়ের জন্য বহু চেষ্টা-তদবির করেছিলেন। ফল অষ্টরম্ভা।
বিএনপি আবার ক্ষমতায় যেতে পারবে, যদি চক্রান্তের রাজনীতি ছেড়ে জনগণ এবং জনগণের রাজনীতির কাছে ফিরে আসে। ভারতে ইন্দিরা গান্ধীর আমলে লোকসভায় বিজেপি’র আসন সংখ্যা ছিল দু’টি। সেই বিজেপি আজ লোকসভায় নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দিল্লির সিংহাসনে অধিষ্ঠিত। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যসভায় বাম সদস্য ছিলেন মাত্র একজন। তিনি জ্যোতি বসু। সেই জ্যোতি বসু রাজ্যসভায় বিশাল বাম সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রায় ত্রিশ বছর একটানা রাজত্ব করেছেন।
এবার বাংলাদেশ সংসদে বিএনপির নির্বাচিত সদস্য মাত্র পাঁচজন। অপর দু’জন গণফোরামের। তারা কী করবেন তা এখনো অনিশ্চিত। আমার ধারণা তারা (অন্তত একজন) সংসদে যোগ দেবেন। বিএনপিরও উচিত সংসদে যোগ দেওয়া। সংসদে এবং সংসদের বাইরে তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা। এবারেও সংসদ বর্জন করে বিদেশি দূতাবাসগুলোতে ছুটাছুটি করে কোনো লাভ হবে না। গণতান্ত্রিক এবং সংসদীয় রাজনীতির পথ ধৈর্যের সঙ্গে আঁকড়ে থাকলে ভারতের বিজেপির মতো বাংলাদেশে বিএনপিও যে একদিন সংসদে বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ক্ষমতায় যেতে পারবে না তা কে বলেছে। তর্জন-গর্জনে কোনো লাভ হবে না। তাতে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম দলটি অস্তিত্ব হারিয়ে মুসলিম লীগের পরিণতি বরণ করতে পারে।
লন্ডন ৫ জানুয়ারি, শনিবার, ২০১৯