এত ঘটনাবহুল বছর খুব বেশি আসেনি ভারতবাসীর জীবনে। ২০১৮-এর অনেকটাই দেশের শীর্ষ আদালত খবরের শিরোনামে ছিল সংস্কার বনাম প্রগতির যুদ্ধ নিয়েই। নতুন বছরেই লোকসভা নির্বাচন। তার আগেই দেশবাসী নানাভাবে বুঝিয়ে দিয়েছে, তারা মোটেও ভালো নেই।
আচ্ছে দিন আসবে, এই স্বপ্ন নিয়েই মানুষ দু’হাত উজাড় করে ভোট দিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদীকে। সেটা ২০১৪ সালের ঘটনা। এরপর পাঁচ বছর গড়িয়ে গেছে। অনেক সভা কর্মসূচি এবং প্রতিশ্রুতি এসেছে। উন্নয়নের লম্বা তালিকা বিভিন্ন সভায় পড়ে পড়ে শোনানো হয়েছে। কিন্তু ২০১৮ সালের শেষ প্রান্তে যখন আরেকটা নির্বাচন দরজায় কড়া নাড়ছে তখন হিসাব করতে বসে দেখা যাচ্ছে, হাতে রয়েছে শুধু সুকুমার রায়ের প্রবাদপ্রতিম সেই পেন্সিল।
এই প্রশ্নে সবচেয়ে বেশি সরব হয়েছিলেন কৃষকরা। ২০১৮ সাল জুড়ে একের পর এক কৃষক বিক্ষোভ আছড়ে পড়েছে দেশের নানা প্রান্তে। ফসলের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, কৃষিঋণ পরিশোধ করতে না পেরে আত্মঘাতী হওয়া, ফসল বিমা যোজনার টাকা না পাওয়া, এরকম একাধিক অভিযোগ এসেছে বছর জুড়ে। আচ্ছে দিন কোথায় গেল, ২০১৮ জুড়ে এই প্রশ্ন তুলেছেন কৃষকরা।
২০১৮ সালে প্রত্যাশিত বিনিয়োগ আসেনি। ফলে নতুন কলকারখানা তৈরি হয়নি। মেহুল চোকসি এবং বিজয় মালিয়াদের কাণ্ডের জেরে ১১টি ব্যাংক মাঝারি ও ক্ষুদ্র ঋণ দেওয়া বন্ধ করেছে। তার ফলে মাঝারি ও ক্ষুদ্র শিল্পে নতুন করে বিনিয়োগ আসেনি। বিমুদ্রাকরণের জেরে টালমাটাল অবস্থা কাটেনি গত বছর। ফলে কৃষির পাশাপাশি শিল্পও খুঁজে মরেছে আচ্ছে দিন। প্রথম তিন বছর বড় কোনো দুর্নীতির অভিযোগ ওঠেনি এনডিএ সরকারের বিরুদ্ধে। কিন্তু ২০১৮ এর গোটা বছরটাই নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহদের ব্যস্ত থাকতে হয়েছে রাফায়েলের লেনদেন নিয়ে রাহুল গান্ধীর অভিযোগ সামলাতে।
গত বছরটা ছিল ধর্মস্থানে মহিলাদের প্রবেশাধিকারের লড়াইয়ের বছর। শনি সিগনা পুর মন্দির ও মুম্বাইয়ের হাজি আলি দরগায় মহিলাদের প্রবেশাধিকারকে মাথায় রেখে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ঐতিহাসিক রায় দেয় সুপ্রিম কোর্ট। শীর্ষ আদালতের রায়ে শতাব্দীপ্রাচীন সবরীমালা মন্দিরের দরজা খুলে যায় সব বয়সী মহিলাদের জন্য। এর আগে ঐ মন্দিরে ঋতুমতী মেয়েদের প্রবেশাধিকার ছিল না। কিন্তু সবরীমালা মন্দিরের রায় নিয়ে বিক্ষোভের ঢেউ ওঠে কেরলে। আদালতের নির্দেশ কার্যকর করতে তত্পর হয় কেরল সরকার। কিন্তু দফায় দফায় আয়াপ্পা মন্দিরের প্রবেশ পথ আটকে দেন প্রতিবাদী ভক্তরা । আয়াপ্পা মন্দিরের প্রধান পুরোহিতও বলেন, ঋতুমতী মহিলারা মন্দিরে ঢোকার চেষ্টা করলে মন্দির বন্ধ করে দেওয়া হবে। সবরীমালার আয়াপ্পা মন্দিরে যাওয়ার পরিকল্পনা করেও মাঝপথে রণে ভঙ্গ দেন সমাজকর্মী ক্রুপ্তি দেশাই। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর কয়েক মাস কেটে গেলেও এখনও সব বয়সী মহিলাদের মন্দির দর্শনের অধিকার পূর্ণতা পায়নি। যদিও বছরের শেষ দিকে মন্দিরে প্রবেশ করতে পেরেছেন চার রূপান্তরকামী।
এমনিতে বিধানসভা নির্বাচন জাতীয় রাজনীতিতে খুব একটা প্রভাব না ফেললেও পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনকে লোকসভা নির্বাচনের সেমিফাইনাল হিসেবে ধরা হচ্ছিল। হিন্দি বলয়ের তিন রাজ্য— মধ্যপ্রদেশ ছত্তিশগড় এবং রাজস্থানে বিজেপি ক্ষমতায় ছিল। তেলেঙ্গানায় চন্দ্রশেখর রাওয়ের টিআরএস এবং মিজোরামে কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল। ৪০ আসনের মিজোরামকে বাড়তি গুরুত্ব দিচ্ছিল বিজেপি। কারণ সেখানে জিতলে উত্তরপূর্বের সাতটি রাজ্যই তাদের দখলে আসত। গো বলয়ের তিন রাজ্য জিততে মরিয়া ছিল কংগ্রেস। ঐ তিন রাজ্যে মায়াবতীর সঙ্গে কংগ্রেসের জোট হওয়ারও কথা চলছিল। কিন্তু ঠিক সেই সময় কংগ্রেসকে বড় ধাক্কা দেন উত্তরপ্রদেশের বহেনজি। কংগ্রেসের আশায় জল ঢেলে দেন তিনি। ছত্তিশগড়ে কংগ্রেসের বদলে তাদের বহিষ্কৃত নেতা অজিত যোগির হাত ধরেন তিনি। রাফায়েল থেকে নোটবন্দি, সার্জিকাল স্ট্রাইক থেকে পরিবারতন্ত্র, সবই উঠে আসে প্রচারে। আর ভোটের ফলাফল প্রকাশের পরেই কংগ্রেসকে সমর্থন করে দিলেন মায়াবতী এবং সমাজবাদী পার্টির অখিলেশ যাদব। এমনকী রাজস্থানেও প্রয়োজনে সমর্থনের কথা জানিয়ে দেন তারা। ফলে পাঁচ রাজ্যেই যে বিজেপি আসছে না, সে ব্যাপারে সীলমোহর পড়ে যায় সেদিনই। ঐ তিন রাজ্যে দাপটে ফিরে আসে কংগ্রেস। মুখ্যমন্ত্রী শপথ নেওয়ার দু’ঘণ্টার মধ্যেই মধ্যপ্রদেশে যাবতীয় কৃষিঋণ মওকুফ করে দেন কমলনাথ।
১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন ক্যাপ্টেন ইমরান খান। ২০১৮ সালে হাল ধরলেন দেশের। ২২ গজের দুনিয়া থেকে পাকিস্তানের ২২তম প্রধানমন্ত্রী হলেন তিনি। পাকিস্তানের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে ১৫৬ আসন পেয়ে সরকার গঠন করে ইমরান খানের তেহরিক এ ইনসাফ। ভোটের ফল প্রকাশের পর প্রায় তিনসপ্তাহ নানা টালবাহানার পর অবশেষে ১৮ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেন ইমরান। প্রথমেই তাঁর নজরে ছিল কাশ্মির সমস্যা। তিনি আলোচনার চেষ্টা চালিয়েছিলেন ভারতের সঙ্গে। তবে তাঁর অভিযোগ, দিল্লি সাড়া দেয়নি তাঁর ডাকে। এরপর তিনি তোপ দাগেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিরুদ্ধে। এরপরেই ইমরানের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হয় ভারতের। তবে ডিসেম্বর মাসে কর্তারপুর করিডরের মাধ্যমে খানিকটা শিথিল হয় দু’দেশের সম্পর্ক।
২০১৮-এর শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কৃষকদের ক্ষোভ, বঞ্চনা, প্রতিবাদ-আন্দোলন দেখেছে ভারত। মুম্বাইয়ের আরব সাগর, রাজস্থানের মরুভূমি, তামিলনাড়ুর ভারত মহাসাগর থেকে শুরু করে রাজধানী দিল্লি সাক্ষী ছিল সেই মহাবিক্ষোভের। দীর্ঘ পথ হেঁটে এসে নিজেদের দাবি জানিয়েছেন কৃষকরা। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরাও বলতে শুরু করেছেন, যদি একটামাত্র কোনো বিষয় আসন্ন লোকসভা নির্বাচনে প্রভাব ফেলে, তবে তা হবে কৃষি সমস্যা, কৃষক বিক্ষোভ। সে কারণে পাঁচ রাজ্যের নির্বাচনী প্রচারে সর্বত্রই দেশের কৃষি সমস্যার কথা তুলে ধরেছিলেন রাহুল গান্ধী।
২০১৮ সালটা দারুণ কাটলো ভারতীয় ফুটবলের। ১০ জন নিয়ে খেলে দেশের ২০ অনূর্ধ্ব ফুটবল টিম মেসির দেশ আর্জেন্টিনাকে হারিয়েছে গত বছরই। স্পেনে আর্জেন্টিনাকে তারা হারিয়েছে ২-১ গোলে। দু’বারে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন দলকে হারিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সমীহ আদায় করে নিয়েছে তারা। তেমনই অনূর্ধ্ব ১৬’র ছেলেরা আম্মানে সৌদি আরবকে আমন্ত্রণমূলক টুর্নামেন্টে হারিয়েছে। এবার ২০১৯ সালের এএফসি কাপে স্টিফেন কনস্টানটাইনের নেতৃত্বে ভারতীয় টিমের দিকে তাকিয়ে সবাই। ঘরোয়া ফুটবলে কাশ্মির আই লিগে দারুণ ভালো খেলেছে। তবে ২০১৮ সালে চমকে দিয়েছেন ভারতীয় কুস্তিগীররা। প্রায় সুপারস্টারের পর্যায়ে চলে গিয়েছেন বজরং পুনিয়া আর ভিনেশ ফোগত। অলিম্পিকের আশা জাগিয়ে জাকার্তা এশিয়াডে সোনা জিতেছেন দু’জনেই।
মি-টু। অক্সফোর্ডের অভিধানে এর অর্থ করা হয়েছে টক্সিক, মানে বিষ। কখনো বস, কখনো সহকর্মী, কখনো সহযাত্রী, সবাই ছোবল দিতে উদ্যত। মুখের ওপর না শুনে শরীর ছুঁয়েছে অযাচিত হাত। ধর্ষণ করতেও পিছপা হয়নি। তবু অনেকেই ধৈর্য ধরেছেন। এক সাহসিনীর ধাক্কায় আগল ভেঙেছেন মহিলারা। সিনেমা জগত্ থেকেই আসতে থাকে একের পর এক মি-টু প্রতিবাদ। প্রায় ১০ বছর পর মুখ খুলে অভিনেতার মুখোশ খুলে দেন তনুশ্রী দত্ত। নানা পাটেকরের হাতে তাকে হেনস্তা হতে হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপরেই এক এক করে অভিযোগ উঠে আসতে থাকে অলোক নাথ, সাজিদ খান, বিকাশ ভ্যালে, সুভাষ ঘাইয়ের নাম। মি-টু’র জেরে মন্ত্রিত্ব খোয়াতে হয় এম জে আকবরকে।
n লেখক : ভারতের প্রবীণ সাংবাদিক