জলবায়ু হুমকি ও বাংলাদেশ

জলবায়ু পরিবর্তন ও তার কুফল নিয়ে বিশ্বের উদ্বেগ-উত্কণ্ঠার কমতি নেই।  সময়ের বিবর্তনে পরিবর্তনশীল জলবায়ুর এই চক্র বিশ্বের বসবাসরত সকল প্রাণীকুলের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।  সম্প্রতি  ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসির) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে রাখতে হলে ২০৩০ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাসের নির্গমন ৪৫ শতাংশ কমাতে হবে। তা না হলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বিশ্বকে বসবাসের অযোগ্য করে তুলবে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে কার্বন ডাই-অক্সাইডের নিঃসরণ কমার চেয়ে বরং বেড়েই চলেছে। পাশাপাশি কমছে মিঠা পানির পরিমাণও। সারা বিশ্বের মতই বাংলাদেশও জলবায়ুর মারাত্মক হুমকিতে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সর্বোচ্চ ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের নাম রয়েছে নবম স্থানে। জার্মানির রুহর বিশ্ববিদ্যালয় বোখাম এবং ডেভেলপমেন্ট হেল্প অ্যালায়েন্স নামে একটি জার্মান বেসরকারি মানবিক সংস্থার যৌথভাবে করা একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এই তথ্য। জনসংখ্যাবহুল এই বাংলাদেশের জন্য এই তথ্য মোটেও ভালো নয়। বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে জলবায়ু পরিবর্তনের যাবতীয় উদ্যোগ আগেভাগেই গ্রহণ করতে হবে। ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোকে পর্যাপ্ত সাহায্য-সহযোগিতা করার আশ্বাস দিয়েছে জাতিসংঘ। অবশ্য বাংলাদেশ এই বিষয়ে এগিয়ে আছে। দুর্যোগপূর্ব বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণের সর্বোপরি ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সরকার। ২০১০ সালের জার্মান ওয়াচের জরিপ অনুযায়ী জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ শীর্ষ অবস্থানে ছিল। প্রায় আট বছরে বাংলাদেশ অনেক দুর্যোগের মোকাবিলা করেছে। সেই জরিপের সূত্র ধরে বর্তমানে অনেকটাই নিচে নেমে এসেছে বাংলাদেশ।

 পরিবেশ বিজ্ঞানীরা বলছেন, বাংলাদেশের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দৃশ্যমান প্রভাব হচ্ছে দক্ষিণাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় লবণাক্ততা বৃদ্ধি। এমনিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে লোনা পানির পরিমাণ কমে যাচ্ছে ফলে সেই স্থানে কমে যাচ্ছে চাষাবাদ ও বসবাস। বাংলাদেশ আয়তনে ছোট পক্ষান্তরে জনসংখ্যায় বহুল তাই দূষণ এই দেশটির মিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। অধিক জনসংখ্যার চাপে বাংলাদেশ বর্তমানে দূষিত একটি ভূ-খণ্ডে পরিণত হয়েছে। বেশ কিছুদিন আগে এক জরিপে বলা হয়েছে রাজধানী ঢাকা দূষিত এবং বসবাসের অযোগ্য।  অতিরিক্ত কার্বন নিঃসরণ এবং বিষাক্ত বিভিন্ন পদার্থ বাতাসে মিশে দেশের সামগ্রিক আবহাওয়ায় পরিবর্তন আনছে। তার উপর বৈশ্বিক জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশকে ক্রমেই বসবাসের অযোগ্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। বাংলাদেশের উপকূলীয় অনেক অঞ্চল ইতোমধ্যে লবণাক্ততার কারণে বসবাস ও চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। যা হয়েছে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে। বিজ্ঞানীরা হুঁশিয়ারি করেছেন এভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি বাড়তে থাকলে বাংলাদেশের অনেক অঞ্চল পানির নিচে চলে যাবে। সৃষ্টি হতে পারে স্থায়ী জলাবদ্ধতা। তাছাড়া এই বিশ্বের উষ্ণতা যতই বাড়ছে হিমালয় ততই গলছে। অতিরিক্ত উষ্ণতার কারণে ঋতুতেও হেরফের দেখা দিচ্ছে। অসময়ে বৃষ্টি, বন্যা হানা দিচ্ছে। সাগরে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন নতুন ঘূর্ণিঝড়। যা বাংলাদেশকে ধ্বংস করতে সক্ষম। আদিকাল থেকে বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড়ের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লালিত-পালিত হয়েছে ফলে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় সাফল্য লাভ করেছে। লক্ষ্য করলেই দেখা যায় অতীতের তুলনায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশে ক্ষয়ক্ষতি অনেক কমে এসেছে। কিন্তু সমুদ্রের লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিরাট খাদ্য ও বাসস্থান সংকটে পড়তে হবে আমাদের। গত ২০ বছরে সাতক্ষীরার মাটিতে লবণ অনেক বেড়েছে। ফলে চাষাবাদের অযোগ্য হয়েছে সেসব জমি। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকি মোকাবিলায় আমাদের আরো সোচ্চার হওয়া জরুরি। লবণাক্ত পানিতে চাষাবাদের যোগ্য ধান আবিষ্কার হলেও তা বেশিদিন চাষ করা সম্ভব নয়। বিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশকে বাঁচাতে হলে পদক্ষেপ নিতে হবে এখনই।

n লেখক:শিক্ষার্থী, সরকারি আজিজুল হক কলেজ, বগুড়া