সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় সিক্ত হলেন প্রবীণ রাজনীতিক ও সততার মূর্ত প্রতীক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম (৬৭)। গতকাল রাতে বেইলি রোডের ২১ নম্বর বাড়িতে কফিনে ফুল দিয়ে শেষবারের মতো প্রয়াত এ রাজনীতিককে শ্রদ্ধা জানান তারা। এর আগে সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে ব্যাংকক থেকে বিমান বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ ফ্লাইটে (বিজি-০৮৯) সৈয়দ আশরাফের মরদেহ হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে পৌঁছায়। কফিনে শুয়ে প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে আসেন আশরাফ। মরদেহের সঙ্গে তাঁর পরিবারের সদস্যরাও দেশে ফিরেছেন।
ক্যান্সারের কাছে হার মেনে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককের বামরুনগ্রাদ হাসপাতালে বৃহস্পতিবার রাত পৌনে ১০টায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, বর্তমান প্রেসিডিয়াম সদস্য ও জনপ্রশাসন মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিথর দেহ দেখে কাঁদলেন সবাই। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের এমপির নেতৃত্বে দলের জাতীয় নেতৃবৃন্দ বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে তাঁর মরদেহ গ্রহণ করেন। এ সময় জাতীয় পতাকা ও আওয়ামী লীগের দলীয় পতাকা দিয়ে তার কফিন মোড়ানো হয়। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামন্ডলীর সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য বেগম মতিয়া চৌধুরী, দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য, কেন্দ্রীয় ১৪ দলের মুখপাত্র এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. আব্দুর রাজ্জাক, আবদুল মতিন খসরু, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ডা. দীপু মনিসহ সেখানে উপস্থিত সবাই ফুল দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠককে শ্রদ্ধা জানান।
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির অধিকারী সৈয়দ আশরাফের মরদেহবাহী গাড়ি রওনা হয় তার ২১ বেইলি রোডে তার সরকারি বাসভবনের উদ্দেশে। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সন্ধ্যা ৭টায় তার মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে বাসভবনে আনা হয়। সেখানে তাকে শেষবারের মতো দেখতে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের হাজারো নেতাকর্মী। শেষ বারের মতো প্রিয় নেতাকে দেখতে সমবেত হয়েছেন ময়মনসিংহ ও কিশোরগঞ্জের নেতাকর্মীরাও; যেখানে শৈশব ও যৌবনের সময়গুলো কেটেছে সৈয়দ আশরাফের। বাড়ির ভেতরের খোলা জায়গায় সামিয়ানা টাঙিয়ে অস্থায়ী মঞ্চ করে সেখানে সৈয়দ আশরাফের কফিন রাখা হয়। এরপর সারি ধরে দাঁড়িয়ে তাকে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান সর্বস্তরের মানুষ, যাদের মধ্যে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও বিচারপতি, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতাকর্মী, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নানা শ্রেণির পেশার মানুষ ছিলেন। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম, নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী ইসমত আরা সাদেক প্রয়াত নেতার কফিনে ফুল দেন।
সৈয়দ আশরাফের কফিনের পাশে একটি শোক বই খোলা হয়। শোক বইয়ে অনেকে তাদের নিজেদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন। নেতাকর্মীরা সৈয়দ আশরাফকে হারানোর বেদনা লিখেছেন শোক বইতে। মরদেহ আসার পর কান্নায় পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শ্রদ্ধা জানানোর জন্য অনেকের হাতে ছিল ফুল। সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালবাসায় সিক্ত হন সৈয়দ আশরাফ। সেখানে মানুষের ঢল নামে। রাত ৮টা ৪৫ মিনিটে সেখান থেকে সৈয়দ আশরাফের মরদেহ নিয়ে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের হিমাগারে রাখা হয়েছে। আজ রবিবার সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় মরহুমের প্রথম নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। এই নামাজে জানাজায় সর্বস্তরের জনগণ অংশগ্রহণ করবেন। এরপর হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ কিশোরগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হবে এবং দুপুর ১২টায় কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাঁ ময়দানে দ্বিতীয় নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। মরহুমের তৃতীয় নামাজে জানাজা দুপুর ২টায় ময়মনসিংহের আঞ্জুমান ঈদগাঁ মাঠে অনুষ্ঠিত হবে। অতঃপর হেলিকপ্টারযোগে মরদেহ ঢাকায় নিয়ে আসা হবে এবং বাদ আছর বনানী কবরস্থানে দাফন সম্পন্ন করা হবে। রাষ্ট্রপতি মোঃ আবদুল হামিদ সকাল সাড়ে ১০টায় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের প্রথম জানাজায় অংশ নেবেন। এদিকে কুলখানির জন্য আগামী মঙ্গলবার দিন নির্ধারণ করা হয়েছে। গতকাল রাতে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের চাচাতো ভাই এবং কিশোরগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল ইসলাম টিটু বলেন, ‘মঙ্গলবার বাদ আছর মরহুম সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের কুলখানি তার বেইলি রোডের সরকারি বাসভবনে অনুষ্ঠিত হবে। দলের সব নেতাকর্মী, শুভানুধ্যায়ীদের কুলখানিতে শরিক হয়ে মরহুমের জন্য দোয়ায় শামিল হওয়ার জন্য অনুরোধ জানান তিনি।’
সৈয়দ আশরাফের কফিনে শ্রদ্ধা জানানোর পর আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমির হোসেন আমু বলেন, সৈয়দ আশরাফ ছিলেন রাজনীতির দিকপাল। বাংলাদেশের রাজনীতিতে তার অবদান অনস্বীকার্য, যা তাকে অবিস্মরণীয় করে রাখবে। তার চলে যাওয়া আমাদের জন্য অপূরণীয় ক্ষতি। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ বিষয়ক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, রাজনৈতিকভাবে উনার কাছে আমি অনেক কিছু শিখেছি। সত্যিই তাকে ভোলা যাবে না। আদর্শের দিক থেকে তিনি কখনও সরে আসেননি। বিপুল জনসমাগমের কারণে লাশবাহী গাড়ি থেকে মরদেহ নামানো সম্ভব হয়নি- এই কারণে দুঃখ প্রকাশ করেছেন সৈয়দ আশরাফের স্বজনরা। এ সময় সবাই মরদেহবাহী গাড়ির ওপর ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।
গতকাল বিকেল থেকে বিমানবন্দ?রের ভি?ভিআই?পি লাউঞ্জে আওয়ামী লীগ নেতারা উপস্থিত হতে শুরু করেন। বিমানবন্দরের ভিভিআইপি টার্মিনালে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, এ কে এম এনামুল হক শামীম, বন ও পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক হাবিবুর রহমান সিরাজ, প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ, সমাজ কল্যাণ সম্পাদক সুজিত রায় নন্দী, উপ-দফতর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, যুব মহিলা লীগের সভাপতি নাজমা আক্তার, ঢাকা মহানগর উত্তর আওয়ামী লীগের সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক বাবু পঙ্কজ দেবনাথসহ অনেকে।
আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ জনপ্রশাসনমন্ত্রীর দায়িত্বে ছিলেন। তিনি আওয়ামী লীগে প্রেসিডিয়াম সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। ২০১৭ সালের ২৪ অক্টোবর সৈয়দ আশরাফুলের স্ত্রী শীলা ইসলাম মারা যাওয়ার পর থেকেই তিনি প্রায় অসুস্থ হয়ে পড়েন। এক কন্যার জনক আশরাফুল ইসলাম ফুসফুসের ক্যান্সারে ভুগছিলেন। অসুস্থতার কারণে তিনি গত বছরের ১৮ সেপ্টেম্বর সংসদ থেকে ছুটি নেন। হাসপাতালে থেকেই তিনি একাদশ সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-১ আসনে নৌকার প্রার্থী হিসেবে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। গত বৃহস্পতিবার সকালে নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে আসতে পারেননি সৈয়দ আশরাফ। পরে স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী জানিয়েছিলেন, শপথের জন্য সময় চেয়ে আবেদন করেছেন নবনির্বাচিত এই সংসদ সদস্য। কিন্তু তার আর শপথ নেওয়া হলো না। তার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সৈয়দ আশরাফের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করা হয়। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ের আনন্দের রেশ কাটতে না কাটতেই শোকে কাতর হতে হলো আওয়ামী লীগকে। লাখো ভক্ত অনুরাগীকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে চলে গেলেন।
বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সন্তান সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বাবার দেখানো পথেই হেঁটেছেন রাজনীতির দীর্ঘসময়। অথচ এত সমৃদ্ধময় জীবনগল্পে আত্মঅহমিকার লেশমাত্র ছিল না। বিনয়ী, মৃদুভাষী আর বিচক্ষণতার মধ্য দিয়েই তিনি সকলের ‘আশরাফ ভাই’ বলে পরিচিতি পান। ২০০৯ সালের ২৪ জুলাইয় আওয়ামী লীগের অষ্টাদশ সম্মেলনে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম। এরপর ২০১২ সালের ৩১ ডিসেম্বর দলের উনিশতম সম্মেলনেও সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৫ সাল থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন সৈয়দ আশরাফ। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করলেও তার বিরুদ্ধে অনিয়ম-দুর্নীতির তেমন কোনও অভিযোগ ওঠেনি। সাদামাটা জীবনযাপনকারী মানুষটি বরাবরই থেকেছেন নির্লোভ-নির্মোহ। জীবনের বাতিঘরে আঁঁধার নামিয়ে এ মহান রাজনীতিক চলে গেলেন না ফেরার দেশে। বর্ণাঢ্য জীবনরেখায় আজ যেন বিষাদের ছেদ। প্রিয় ব্যক্তিকে হারিয়ে শোকের সাগরে মাতম করছেন আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। শোক প্রকাশে কার্পণ্য করেননি অন্য দলের নেতারাও। সবাই বলছেন, আশরাফ আমাদের মাঝে অনন্তকাল বেঁচে থাকবেন আদর্শের দিশারি হয়ে।
কাঁদলেন কাদের
আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সন্ধ্যায় বিমানবন্দর থেকে বের হওয়ার পথে সাংবাদিকদের বলেন, সদ্য প্রয়াত আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা পর পর দুই বার তাকে দলীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তার চলে যাওয়া দলের অপূরণীয় ক্ষতি। রাজনীতিতে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম ছিলেন তার অগ্রজ অভিভাবক, দীর্ঘদিনের সহকর্মী। সাংগঠনিকভাবে আওয়ামী লীগের দ্বিতীয় প্রধান বা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে আশরাফ যে দায়িত্ব সামলাতেন, সে দায়িত্বই এখন তার কাঁধে। মুক্তিযুদ্ধকালীন রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের ছেলে আশরাফের সঙ্গে যে স্মৃতি জমেছিল, সেই স্মৃতি হূদয়পটে ভেসে উঠতেই অঝোরে কেঁদে ফেলেন ওবায়দুল কাদের। পাশে থাকা দলীয় নেতাকর্মীদের সান্ত্বনাও থামাতে পারছিল না দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিভাবক হারানোর এই বেদনা। কাদেরের পাশাপাশি আশরাফের স্বজনদের কান্নায় আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন আওয়ামী লীগের অন্য নেতাকর্মীরাও।