শেষ হয়ে গেল একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। গত রবিবার অনুষ্ঠিত হওয়া ভোটে জেলার ৫টি আসনেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে মহাজোটের বিপুল জয় হয়েছে। তিনটিতে আওয়ামী লীগ ও দুটিতে জাতীয় পার্টির জয় হয়েছে। সে কারণে এখন সবার নজর পড়েছে উপজেলা নির্বাচনের দিকে।
জানা গেছে, জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বিশাল কর্মযজ্ঞ শেষ করেই এবার প্রায় ৫০০ উপজেলায় নির্বাচন আয়োজন করতে যাচ্ছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমদিকে এ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করবে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানটি। নারায়ণগঞ্জ জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা গেছে, ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হয় সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন। সে নির্বাচনে বিএনপির আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন যার বিরুদ্ধে বিগত দিনে সরকার দলের নেতাদের সঙ্গে আঁতাত করে কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে। সদর উপজেলার কিছু এলাকা নিয়ে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন গঠন হওয়ায় ওইসব এলাকা বাদ দিয়ে উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮ (২০০৯ সনের ৩০ জুন সংশোধিত) এ প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার সদর উপজেলা পুনর্গঠন করে। ২০১৪ সালের ৪ মার্চ এ সংক্রান্ত একটি গেজেট প্রকাশ করা হয়। এদিকে কয়েকটি এলাকা বাদ দিয়ে উপজেলা গঠন হওয়ায় গত বছর ৬ এপ্রিল উচ্চ আদালতে একটি রিট করা হয়। যার পিটিশন নং- ৩০৮৯। এ রিট করেন ফতুল্লা চৌধুরী বাড়ির মৃত সুলতান বক্স চৌধুরীর ছেলে মো. আসাদউদ্দিন চৌধুরী, পশ্চিম মাসদাইরের মৃত মতিউর রহমানের ছেলে বজলুর রহমান ও কাশিপুর উত্তর গোয়ালবন্দের হেলালউদ্দিন মুন্সীর ছেলে মো. হামিম মুন্সী। রিট আবেদনকারী ৩ জনই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিএনপির রাজনীতির সাথে জড়িত। আসাদউদ্দিন চৌধুরী সম্পর্কে জানা গেছে, তিনি নিতান্ত একজন ছাপোষা গোছের লোক। লেখাপড়া তেমন জানেন না। ফতুল্লা ইউনিয়ন ৪ নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও আজাদ বিশ্বাসের ভায়রা মোস্তাফিজুর রহমান রুমী চৌধুরীর কাজকর্ম দেখে থাকেন তিনি। ২নং আবেদনকারী বজলু তৈমুর আলমের ভাগ্নে ও ছাত্রদল নেতা রুশোর ভাই। অপরজন হামিম মুন্সী কাশিপুর গোয়ালবন্দ এলাকার যুবদল নেতা ও আজাদ বিশ্বাসের কর্মী বলে পরিচিত। তিনজন অপরিচিত মুখ দিয়ে আদালতে রিট করার পেছনের কারিগর বর্তমান উপজেলা চেয়ারম্যান এ কথা আড়ালে আবডালে স্বীকার করেছেন অনেক বিএনপি নেতা। একটি সূত্র জানায়, আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই এ জটিলতার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। তখন নির্বাচন নিয়ে আর কোনো বাধা থাকবে না।
এদিকে আবুল কালাম আজাদ বিশ্বাস জানান, তিনি এ ব্যাপারে কিছুই জানেন না। একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে, সদর উপজেলা নিয়ে বেশ কয়েকজনের আগ্রহ ছিল। তাদের মধ্যে ফতুল্লা থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সাইফউল্লাহ বাদলকে ইতোমধ্যে অনেকটা জোর করেই কাশীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বানানো হয়েছে। আবু হাসনাত মো. শহিদ বাদল যিনি ২০০৯ সালের নির্বাচনে অংশ নিয়ে পরাজিত হয়েছেন। তিনি এখন জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি। ফলে হেভিওয়েট এ দুইজন আপাতত প্রার্থী হচ্ছেন না। তবে শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজন মহানগর আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক শাহ নিজাম এখানে প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে।
একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির জেলার সভাপতি চন্দন শীলকে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বানানোর চেষ্টা ছিল শামীম ওসমানের। কিন্তু শেষতক অনেক নাটকীয়তার পর সেখানে মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি আনোয়ার হোসেনকে মনোনয়ন প্রদান করা হয় এবং পরে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বীতায় চেয়ারম্যান হন। আওয়ামী লীগের একটি অংশ চাচ্ছে পুরস্কার হিসেবে চন্দন শীলকে চেয়ারম্যান প্রার্থী করতে, আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দিতে। যদিও শামীম ওসমানের ঘনিষ্ঠজনদের একটি গ্রুপ চাচ্ছেন শাহ নিজামকে চেয়ারম্যান প্রার্থী করতে। তবে বেশিরভাগ নেতাকর্মীই মনে করছেন ১৬ জুন চাষাঢ়া আওয়ামী লীগ অফিসে বোমা হামলায় দুই পা হারানো চন্দন শীলকে পুরস্কার ও ত্যাগের প্রতিদানস্বরূপ চেয়ারম্যান মনোনয়ন দেওয়া উচিত।
রাজনীতি বোদ্ধাদের মতে, সদর উপজেলা নির্বাচন ঘোষণা হওয়ার পর থেকেই লাভের পাল্লা চলে যাবে সরকার ও স্থানীয় আওয়ামী লীগের কোর্টে। বন্দর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান হলেন মুকুল। তিনি মহানগর বিএনপির সহ-সভাপতি। ওসমান পরিবারের ঘনিষ্ঠ। আর সে কারণেই বিগত নির্বাচনে তিনি জয়ী হয়েছেন। আর সবশেষ গত ৩০ ডিসেম্বর সংসদ নির্বাচনে তিনি সরাসরি মহাজোটের প্রার্থী সেলিম ওসমানের জন্য আদাজল খেয়ে মাঠে নামেন। খোদ ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী আকরামের অভিযোগ একাদশ নির্বাচনে মুকুল বিএনপির ভোটারদের কেন্দ্র থেকে বের করে দিয়েছেন। এবার মুকুলও চাচ্ছেন মনোনয়ন পেতে এবং সেই সঙ্গে জয় পেতে। তবে বিএনপি ভবিষ্যতে মুকুলকে মনোনয়ন দিচ্ছে না এটাও নিশ্চিত। সে কারণে এবার তিনি নির্দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। চেষ্টা করবেন জাতীয় পার্টির এমপির সমর্থন নিতে। অপরদিকে বন্দর থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি মুক্তিযোদ্ধা এম এ রশিদও চাচ্ছেন ভোটে থাকতে। সর্বশেষ নির্বাচনে আতাউর রহমান মুকুল পান ১৯ হাজার ৫৪৩ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন প্রধান পান ১১ হাজার ১৩২ ভোট। তিনি জাতীয় পার্টির নেতা। ১০ হাজার ৮৮১ ভোট পেয়ে তৃতীয় হন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এম এ সালাম যিনি মদনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান।