রিয়াদের অপেক্ষার মিষ্টি ফল

বাংলাদেশের শীর্ষ পাঁচ ক্রিকেটারের একজন তিনি। মাশরাফি বিন মুর্তজা, তামিম ইকবাল, সাকিব আল হাসান ও মুশফিকুর রহিমের সাথে তিনিও আধুনিক বাংলাদেশ ক্রিকেটে কিংবদন্তিদের একজন। তবে, অবাক করার মতো ব্যাপার হলো গতকালকের আগে এবছর টেস্টে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ করতে পেরেছিলেন মাত্র একটা হাফ সেঞ্চুরি। একমাত্র টেস্ট সেঞ্চুরিটাও এসেছে আট বছরেরও বেশি সময় আগে।

তাই, সাকিব আল হাসানের ডেপুটি হিসেবে এই সিরিজে অধিনায়ক হিসেবে খেলা রিয়াদের একাদশে জায়গা নিয়েও আড়ালে-আবডালে আওয়াজ উঠতে শুরু করেছিল। মিরপুর টেস্ট শুরুর আগে আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে রিয়াদ এই নিয়ে প্রশ্নের মুখেও পড়েছিলেন। রিয়াদ সেদিন বলেছিলেন, একটা ভালো ইনিংসই বদলে দিতে পারে সব কিছু!

হ্যাঁ, গতকাল আক্ষরিক অর্থেই সব কিছু বদলে গেল। অনেক অপেক্ষার পর রিয়াদ পেয়ে গেলেন প্রত্যাশিত সেই ভালো ইনিংস। আট বছর নয় মাস, ৩৫ টেস্ট ও ৬৯টি ইনিংস পর টেস্ট ক্রিকেটে সেঞ্চুরির দেখা পেলেন ডানহাতি এই ব্যাটসম্যান। এত লম্বা সময় বিরতি দিয়ে এর আগে কোনো ব্যাটসম্যানই টেস্ট সেঞ্চুরির দেখা পাননি। নিশ্চয়ই এই রেকর্ডটা রিয়াদ মনে রাখতে চাইবেন না।

আগে এই রেকর্ডটি ছিল মোহাম্মদ আশরাফুলের। ২০০১ সালে সেপ্টেম্বরে অভিষেক টেস্টে সেঞ্চুরির পর আশরাফুল দ্বিতীয় সেঞ্চুরি করেছিলেন ২০০৪ সালের ডিসেম্বরে। মাঝে খেলেছিলেন ২২ টেস্ট। এখনকার ব্যাটসম্যানদের মধ্যে সর্বশেষ সেঞ্চুরির পর ১৬ টেস্ট খেলে ফেলেছেন ইমরুল কায়েস।

দুই টেস্ট সেঞ্চুরির মাঝে দীর্ঘতম অপেক্ষার বিশ্বরেকর্ডটি নিউজিল্যান্ডের উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান অ্যাডাম প্যারোরের দখলে। ৭৮ টেস্টের ক্যারিয়ারে দুটি সেঞ্চুরি করেছিলেন তিনি, দুই সেঞ্চুরির মাঝে খেলেছিলেন ৫৭ টেস্ট। আরেক উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান দক্ষিণ আফ্রিকার মার্ক বাউচারের দুই সেঞ্চুরির মাঝে ব্যবধান ছিল ৫০ টেস্টের।

২০১০ সালে হ্যামিল্টনে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে টেস্ট ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় বছরেই প্রথম সেঞ্চুরিটা পেয়ে গিয়েছিলেন রিয়াদ। সেখান থেকে টেস্ট ক্রিকেটে তার গ্রাফটা যেমন হওয়া দরকার ছিল, তেমন হয়নি। এর মধ্যে ১৩টা হাফ সেঞ্চুরি পেলেও, সেঞ্চুরি আসছিল না। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার হলো, গেল আট বছরে রিয়াদ টি-টোয়েন্টি ও ওয়ানডে ফরম্যাটে যেমন নিজেকে অপরিহার্য সদস্যে পরিণত করেছিলেন নিজের পারফরম্যান্স দিয়ে, টেস্টে সেটা হয়নি।

যদিও, গতকাল মিরপুরের ২২ গজে দেখা গেল দায়িত্বশীল আর দারুণ ছন্দশীল এক রিয়াদকেই।  কি প্রচণ্ড চাপের মুখেই না তিনি ব্যাট করতে নেমেছিলেন। উইকেটে যখন আসেন, তখন মাত্র ২৫ রানের মধ্যে সাজঘরে ফিরে গেছেন প্রথম চার ব্যাটসম্যান। এমন ব্যাটিং বিপর্যয়ে জিম্বাবুয়েকে ফলোঅনে আবারো ব্যাট করতে না পাঠানোর সিদ্ধান্তটাও প্রশ্নের মুখে পড়েছিল। অধিনায়ক হিসেবে রিয়াদ নিজেই যেন সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছিলেন!

পঞ্চম উইকেট জুটিতে তিনি অভিষিক্ত মোহাম্মদ মিঠুনকে নিয়ে যোগ করেন ১১৮ রান। এখানেই বাংলাদেশের আকাশসমান লিড নেওয়াটা নিশ্চিত হয়। এরপর আট রানের মধ্যে দুই উইকেট পতন ঘটলেও রিয়াদ ছিলেন অবিচল। সপ্তম উইকেটে সঙ্গী হিসেবে পান প্রথম ইনিংসের হাফ সেঞ্চুরিয়ান মেহেদী হাসান মিরাজকে। এবার যোগ হয় ৭৩ রান। অসমাপ্ত এই জুটির শেষটা রাঙিয়ে দেন স্বয়ং রিয়াদই। নিজের ইনিংসের ১২২তম বলে চারটি চার ও দু’টি ছক্কার সৌজন্যে পেয়ে যান ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি।

প্রথম সেঞ্চুরিটা ছিল নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধ কন্ডিশনে। এবারেরটা পরিচিত কন্ডিশনে হলেও এর গুরুত্বও কম নয়। কারণ একেতো দল তখন টপ অর্ডার হারিয়ে ধুঁকছিল। আর রিয়াদের নিজেরও অনেক সমালোচনার জবাব দেওয়ার ছিল। রিয়াদ সেটা করতে পেরেছেন, এবার রিয়াদের হাত ধরে বাংলাদেশ জিতে গেলেই মিরপুর টেস্টে বাংলাদেশের সাফল্যের ষোলকলা পূর্ণ হয়!

স্কো  র   কা  র্ড

বাংলাদেশ প্রথম ইনিংস : ১৬০ ওভারে ৫২২/৭ ডিক্লেয়ার

জিম্বাবুয়ে প্রথম ইনিংস : ১০৫.৩ ওভারে ৩০৪/১০

বাংলাদেশ দ্বিতীয় ইনিংস :

ব্যাটসম্যান                                 রান    বল       চার    ছয়

লিটন বোল্ড ব জার্ভিস                   ৬       ১৪       ০      ০

ইমরুল ক মাভুতা ব জার্ভিস           ৩       ১২       ০      ০

মুমিনুল ক চাকাবভা ব ত্রিরিপানো   ১       ৫         ০      ০

মিথুন ক চাকাবভা রাজা                         ৬৭      ১১০  ৪  ১

মুশফিক ক মাভুতা ব ত্রিরিপানো     ৭       ১৯       ১       ০

মাহমুদুল্লাহ অপরাজিত                           ১০১     ১২২   ৪  ২

আরিফুল বোল্ড ব উইলিয়ামস         ৫       ৮         ০      ০

মিরাজ অপরাজিত                       ২৭     ৩৪       ২       ০

অতিরিক্ত (বা-৫, লে বা-১, ও-১)    ৭

মোট (৫৪ ওভার)                        ২২৪/৬ ডিক্লেয়ার

জিম্বাবুয়ে বোলিং :

কাইল জার্ভিস : ১১-২-২৭-২,  ডোনাল্ড ত্রিরিপানো : ১১-১-৩১-২, সিন উইলিয়ামস : ১৬-২-৬৯-১ (ও-১), সিকান্দার রাজা : ৭-০-৩৯-১, ব্রান্ডন মাভুতা : ৯-০-৫২-০।

জিম্বাবুয়ে ইনিংস :

মাসাকাদজা ক মোমিনুল ব মিরাজ  ২৫     ৬৮      ১       ০

ব্রায়ান চারি এলবিডব্লু ব তাইজুল     ৪৩     ৮২       ৩      ১

টেইলর অপরাজিত                       ৪       ২১       ০      ০

উইলিয়মস অপরাজিত                  ২       ৯         ০      ০

অতিরিক্ত (বা-১, লে বা-১)            ২

মোট (৩০ ওভার)                        ৭৬/২

বাংলাদেশ বোলিং :

মুস্তাফিজুর : ৩-১-২-০, তাইজুল : ১৩-২-৩৪-১, খালেদ : ৪-১-১৫-০, মিরাজ : ৭-২-১৬-১, আরিফুল : ৩-১-৭-০।